যশোর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা মহড়া অনুষ্ঠিত হয়। এই অনুশীলনের মূল উদ্দেশ্য হাইজ্যাক, বোমা হামলা ইত্যাদি জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সক্ষমতা পরীক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার সমন্বয় শক্তিশালী করা। মহড়ার তত্ত্বাবধান করেন বেবিচক (সিভিল এভিয়েশন অথরিটি) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক, যিনি সরাসরি পর্যবেক্ষণ করেন। আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতি দুই বছরে একবার এমন মহড়া বাধ্যতামূলক, তাই এই আয়োজনের আইনি ভিত্তি স্পষ্ট।
মহড়ার দৃশ্যপটের মধ্যে সকাল ১১টা ২৫ মিনিটে ঢাকা থেকে যশোরের দিকে যাত্রা করা এয়ার বাংলাদেশ-২৪৭ ফ্লাইটের ১০ জন যাত্রীসহ বিমানকে বোমা সংক্রান্ত বেনামি হুমকি জানানো হয়। হুমকি প্রাপ্তির দশ মিনিটের মধ্যে বিমানবন্দরের জরুরি অপারেশন সেন্টার ‘ফুল এয়ারপোর্ট ইমার্জেন্সি’ ঘোষণা করে সক্রিয় করে। তৎক্ষণাৎ বিমানবাহিনী, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, র্যাব, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট ইউনিট সমন্বিতভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
মহড়ায় অংশগ্রহণকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক), বাংলাদেশ বিমানবাহিনী, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, সিএএবি, র্যাব, এপিবিএন, আনসার, ফায়ার সার্ভিস এবং সিভিল সার্জন অফিসের মেডিকেল টিম অন্তর্ভুক্ত। প্রত্যেক সংস্থা তাদের নির্ধারিত ভূমিকা পালন করে, যেমন বিমানবাহিনী বায়ু নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, সেনাবাহিনী ভূমি নিরাপত্তা ও সীমানা রক্ষা করে, র্যাব সাইবার হুমকি পর্যবেক্ষণ করে, এবং ফায়ার সার্ভিস জরুরি অগ্নি ও উদ্ধার কাজের জন্য প্রস্তুত থাকে।
বেবিচক চেয়ারম্যানের মন্তব্য থেকে স্পষ্ট হয় যে এই ধরনের মহড়া কেবল নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলার প্রস্তুতি বাড়ায় না, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানের সাথে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে সহায়তা করে। নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ ও সমন্বয় প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা বিমানবন্দর পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধি করে, যা এয়ারলাইন ও ভ্রমণকারীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
যশোর বিমানবন্দরের নতুন বহির্গমন টার্মিনাল ও এপ্রোনের নির্মাণ কাজ ইতিমধ্যে সমাপ্ত হয়েছে, এবং রানওয়ে শক্তিবৃদ্ধিকরণ প্রকল্প চলমান। এই অবকাঠামোগত উন্নয়ন ভবিষ্যতে বৃহত্তর আকারের বিমান পরিচালনা সক্ষম করবে, ফলে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় রুটে ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। অবকাঠামো উন্নয়ন এবং নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ একসাথে বিমানবন্দরের ব্যবসায়িক আকর্ষণ বাড়াবে, বিশেষ করে পর্যটন ও বাণিজ্যিক কার্গো সেক্টরে।
নিরাপত্তা মহড়া সম্পন্ন হওয়া এয়ারলাইন অপারেটরদের জন্য একটি ইতিবাচক সংকেত। আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা প্রোটোকল অনুসরণ করা হলে বিদেশি ক্যারিয়ারগুলো যশোরকে নতুন গন্তব্য হিসেবে বিবেচনা করতে পারে। ফলে এয়ারলাইন টিকিটের চাহিদা, এয়ারপোর্ট ল্যান্ডিং ফি এবং টার্মিনাল সেবা থেকে আয় বৃদ্ধি পেতে পারে। এছাড়া, নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়া ব্যবসায়িক পরিবেশ বিনিয়োগকারীদের আস্থা জোগায়, যা বিমানবন্দরের ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ প্রকল্পে তহবিল সংগ্রহ সহজ করে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামো উন্নয়ন সরাসরি বিমানবন্দরের ক্যাপাসিটি ও রেভিনিউ বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত। নিরাপত্তা ঝুঁকি হ্রাস পেলে বিমানের ডিলেই কমে, যা এয়ারলাইনগুলোর অপারেশনাল খরচ কমায় এবং গ্রাহকের সন্তুষ্টি বাড়ায়। তদুপরি, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল সার্জন টিমের অংশগ্রহণ জরুরি চিকিৎসা ও অগ্নি সেবা দ্রুত প্রদান নিশ্চিত করে, যা বিমানের রক্ষণাবেক্ষণ ও সেবা মানের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
অবশেষে, আন্তর্জাতিক সিভিল এভিয়েশন সংস্থার (ICAO) নির্দেশনা মেনে প্রতি দুই বছরে একবার নিরাপত্তা মহড়া চালিয়ে যাওয়া দেশের সামগ্রিক এয়ার ট্র্যাভেল ইন্ডাস্ট্রির স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে। নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও সমন্বয় প্রক্রিয়া ভবিষ্যতে সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় দ্রুত প্রতিক্রিয়া সময় নিশ্চিত করবে, ফলে যশোর বিমানবন্দরের সুনাম আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দৃঢ় হবে। এই ধারাবাহিকতা বিনিয়োগ, পর্যটন ও বাণিজ্যিক লজিস্টিক্সের জন্য একটি স্থিতিশীল পরিবেশ গড়ে তুলবে, যা দেশের অর্থনৈতিক বৃদ্ধিতে অবদান রাখবে।



