বিশেষ আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা লুৎফে সিদ্দিকি আজ ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে একটি সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই সপ্তাহের শেষ অথবা পরের সপ্তাহের শুরুর দিকে বাংলাদেশে আরোপিত পারস্পরিক শুল্কে হ্রাসের ঘোষণা দিতে পারে।
সিদ্দিকি ডাভোসে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম (WEF) সম্পর্কিত বাংলাদেশ সরকারের অংশগ্রহণ ও ফলাফল সম্পর্কে মিডিয়াকে সংক্ষিপ্ত briefing প্রদান করার পর এই মন্তব্য করেন। তিনি উল্লেখ করেন, ওয়াশিংটন শুল্ক কমাতে ইচ্ছুক এবং শীঘ্রই আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের প্রত্যাশা করা হচ্ছে, তবে বর্তমান ২০ শতাংশ শুল্ক কতটা কমবে তা এখনও স্পষ্ট নয়।
ডাভোস সম্মেলনের পার্শ্ববর্তী সময়ে সিদ্দিকি মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্টের সঙ্গে আলাপ করেন। উভয় পক্ষই শুল্কের পাশাপাশি নন-ট্যারিফ নীতিগুলোর সঙ্গতি নিয়ে আলোচনা করেন, যা বাংলাদেশ সরকারের সংস্কার পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে উভয়েই মত পোষণ করেন।
সিদ্দিকি উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ছয় বিলিয়ন ডলার থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। এই উন্নতি শুল্ক হ্রাসের ইচ্ছাকে শক্তিশালী করে এবং শীঘ্রই একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্তের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে, সিদ্দিকি ইউরোপীয় কমিশনার রক্সানা মিনজাটু ও জোসেফ সিকেলার সঙ্গে ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট (FTA) নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা জানান। বাংলাদেশ সরকার স্পষ্টভাবে এফটিএ চায় এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নও আগ্রহ প্রকাশ করেছে, তবে প্রক্রিয়াটি ধীরগতিতে অগ্রসর হচ্ছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন বর্তমানে ভারত সঙ্গে এফটিএ চুক্তি সম্পন্ন করার পথে এবং পরবর্তীতে ভিয়েতনামকে লক্ষ্য করতে পারে, যা বাংলাদেশের জন্য অতিরিক্ত প্রতিযোগিতার সৃষ্টি করতে পারে। সিদ্দিকি এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ না করে, আলোচনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার আহ্বান জানান এবং ভবিষ্যৎ সরকারকে বিস্তারিত নোট সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দেন।
একই সময়ে তিনি উল্লেখ করেন, লিডারশিপ ডেভেলপমেন্ট ক্যাটেগরি (LDC) থেকে স্নাতক হওয়ার পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের GSP Plus সুবিধা বজায় রাখা কঠিন হবে। গার্মেন্টস রপ্তানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা যদি অব্যাহত থাকে, তবে একক পণ্যের উপর কেন্দ্রীভূত রপ্তানি কাঠামো GSP Plus সুবিধা হারানোর ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।
বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে শুল্ক হ্রাসের সম্ভাবনা বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের মূল্যের প্রতিযোগিতা বাড়াবে, বিশেষ করে টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস সেক্টরে। আমদানিকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কম শুল্কের ফলে খরচ হ্রাস পাবে, যা সরবরাহ শৃঙ্খলে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়তা করবে।
তবে শুল্ক হ্রাসের সুনির্দিষ্ট মাত্রা না জানার কারণে বাজারে তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়া সীমিত থাকতে পারে। ব্যবসায়িক পরিকল্পনা ও মূল্য নির্ধারণে অনিশ্চয়তা রয়ে যাবে, ফলে রপ্তানিকারকরা সতর্কতা অবলম্বন করতে পারেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে এফটিএ আলোচনার ধীরগতি বাংলাদেশের জন্য বর্তমান শুল্ক বাধা বজায় রাখে, যা রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। গার্মেন্টস ছাড়া অন্যান্য পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে না পারলে বাজারের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাবে।
সিদ্দিকি জোর দিয়ে বলেন, একক পণ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দূর করে রপ্তানি পোর্টফোলিও বিস্তৃত করা জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে GSP Plus সুবিধা হারানোর ঝুঁকি কমে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে সরকার ও শিল্প সংস্থাগুলোকে নতুন পণ্য উন্নয়ন ও বাজার অনুসন্ধানে ত্বরান্বিত করতে হবে।
সারসংক্ষেপে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক হ্রাসের সম্ভাব্য ঘোষণা বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের জন্য স্বল্পমেয়াদে ইতিবাচক সংকেত দেয়, তবে শুল্কের হ্রাসের পরিমাণ ও সময়সূচি অনিশ্চিত থাকায় ব্যবসায়িক পরিকল্পনা সতর্কভাবে গঠন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে এফটিএ আলোচনার অগ্রগতি ধীর হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদে রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণ ও গার্মেন্টসের ওপর নির্ভরতা কমানোর কৌশল গড়ে তোলা জরুরি। এই দুই দিকের সমন্বয়ই বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ভারসাম্য রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান বজায় রাখার মূল চাবিকাঠি হবে।



