হিজবুল্লাহর শীর্ষ নেতা নাঈম কাসেম আল-মানার টেলিভিশন চ্যানেলে ইরানের ওপর কোনো সামরিক আক্রমণ হলে গোষ্ঠী নিরপেক্ষ থাকতে পারবে না বলে সতর্কতা প্রকাশ করেছেন। তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির প্রতি কোনো হুমকি হিজবুল্লাহর নিজের নিরাপত্তার সরাসরি হুমকি হিসেবে গণ্য হবে। এই বক্তব্য ইরান-লেবানন সম্পর্কের গভীরতা এবং অঞ্চলে গোষ্ঠীর কৌশলগত অবস্থানকে পুনরায় উন্মোচন করেছে।
হিজবুল্লাহ ইরানের সঙ্গে ধর্মীয় ও কৌশলগত বন্ধন ভাগ করে নেয়, যা দু’দেশের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্বার্থকে একত্রে বাঁধে। কাসেমের এই মন্তব্য গোষ্ঠীর ইরানের প্রতি আনুগত্যের প্রকাশ এবং সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতের ক্ষেত্রে লেবাননের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিবেশে প্রভাবের ইঙ্গিত দেয়।
নাঈম কাসেম যুক্তরাষ্ট্রের ইরানের বিরুদ্ধের নীতি সম্পর্কে অতীতের দৃষ্টিকোণ থেকে মন্তব্য করেন। তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর ষড়যন্ত্র চালিয়ে আসছে। এই ধারাবাহিক বিরোধের পটভূমিতে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক ও সামরিক পদক্ষেপগুলোকে তিনি দীর্ঘমেয়াদী শত্রুতার অংশ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
কাসেমের মতে, ১৯৮০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্র ইরাককে ব্যবহার করে ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ শুরু করেছিল। তিনি উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের ইরাকের সঙ্গে সমন্বয় ইরানের ওপর আক্রমণাত্মক কৌশল গড়ে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ছিল। এই ঐতিহাসিক তথ্য হেজবুল্লাহর বর্তমান সতর্কতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে, সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ সংঘাতের পূর্বাভাস দেয়।
১৯৮০ সালের ইরাক-ইরান যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ইরাককে আর্থিক, সামরিক ও গোয়েন্দা সহায়তা প্রদান করেছিল, যা ইরানের ভূখণ্ডীয় অখণ্ডতা ও স্বায়ত্তশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছিল। হেজবুল্লাহ এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে স্মরণ করে, ইরানের নিরাপত্তা হুমকির মুখে গোষ্ঠীর সক্রিয় ভূমিকা নিতে ইচ্ছুকতা প্রকাশ করেছে।
ইরানের নেতৃত্বও পূর্বে বহিরাগত হুমকির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনি বহুবার ইরানের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন আহ্বান করেছেন এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতি সতর্কতা দিয়েছেন। কাসেমের মন্তব্য এই ইরানি নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যা হেজবুল্লাহকে ইরানের কূটনৈতিক ও সামরিক কৌশলে সমন্বিত অংশীদার হিসেবে উপস্থাপন করে।
হিজবুল্লাহর এই সতর্কতা লেবাননের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবেশে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে। গোষ্ঠীর সম্ভাব্য সামরিক জড়িততা লেবাননের সশস্ত্র বাহিনীর ভারসাম্যকে পরিবর্তন করতে পারে এবং দেশের নিরাপত্তা কাঠামোতে চাপ বাড়াতে পারে। এছাড়া, হেজবুল্লাহর সক্রিয় ভূমিকা ইসরায়েল ও সৌদি আরবের মতো প্রতিবেশী দেশের কৌশলগত পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলতে পারে।
ইসরায়েল ইতিমধ্যে ইরানের পারমাণবিক প্রোগ্রাম ও সশস্ত্র নেটওয়ার্কের প্রতি সতর্কতা প্রকাশ করেছে এবং লেবাননের গোষ্ঠীর সম্ভাব্য হস্তক্ষেপকে নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে। হেজবুল্লাহর সরাসরি হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা ইসরায়েলের সামরিক পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতে পারে এবং অঞ্চলে নতুন সশস্ত্র উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে।
সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো পশ্চিমা মিত্র দেশগুলোও ইরানের নিরাপত্তা হুমকির প্রেক্ষাপটে হেজবুল্লাহর ভূমিকা পর্যবেক্ষণ করছে। গোষ্ঠীর সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ লেবাননের অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই, এই সতর্কতা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা গতি-প্রকৃতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ভবিষ্যতে হেজবুল্লাহ ইরানের সঙ্গে সমন্বয় বাড়িয়ে, ইরানের বিপক্ষ গোষ্ঠী বা দেশগুলোর বিরুদ্ধে সমন্বিত সামরিক কৌশল গড়ে তুলতে পারে। গোষ্ঠীর সামরিক প্রশিক্ষণ, অস্ত্র সরবরাহ ও লজিস্টিক সহায়তা ইরানের নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে, যা লেবাননের নিরাপত্তা পরিবেশকে আরও জটিল করে তুলবে।
সারসংক্ষেপে, নাঈম কাসেমের সতর্কতা হেজবুল্লাহর ইরানের প্রতি অঙ্গীকারের পুনর্ব্যক্তি এবং সম্ভাব্য আঞ্চলিক সংঘাতের পূর্বাভাস দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক নীতি ও ১৯৮০-এর দশকের ইরাক-ইরান যুদ্ধের উল্লেখ গোষ্ঠীর বর্তমান অবস্থানকে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে স্থাপন করে। এই বিবৃতি লেবানন, ইরান এবং বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা গতি-প্রকৃতিতে নতুন দিকনির্দেশনা সৃষ্টি করবে।



