মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বুধবার ইউরোপীয় দেশগুলো রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘর্ষের আর্থিক বোঝা বাড়াচ্ছে বলে সতর্কবার্তা দেন। তিনি উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়া থেকে তেল ক্রয়ের জন্য ভারত এ-তে ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে, আর ইউরোপীয় জোট একই সময়ে ভারত এ-র সঙ্গে ঐতিহাসিক মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এই পার্থক্যই ইউরোপকে নিজেরাই যুদ্ধের অর্থ বহন করতে বাধ্য করছে, বেসেন্টের মতে।
বেসেন্টের বক্তব্য অনুসারে, রাশিয়া থেকে তেল সরাসরি ভারত এ-তে পৌঁছায়, যেখানে তা পরিশোধিত পণ্যে রূপান্তরিত হয়। এরপর এই পণ্যগুলো ইউরোপীয় বাজারে বিক্রি হয়, ফলে ইউরোপীয় দেশগুলো রাশিয়ার তেল বিক্রির মাধ্যমে অর্জিত আয়কে পরোক্ষভাবে রাশিয়ার সামরিক ব্যয়ে ব্যবহার করছে। তিনি যুক্তি দেন, এই চক্রই ইউরোপকে নিজেরাই যুদ্ধের আর্থিক দায়িত্ব নিতে বাধ্য করছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২৫ শতাংশ শুল্কের পাশাপাশি, ভারত এ-র ওপর মোট ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। শুল্কের উদ্দেশ্য রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের তহবিল কেটে ফেলতে এবং ভারত এ-কে রাশিয়া থেকে তেল ক্রয় বন্ধ করতে প্রণোদনা দেওয়া। বেসেন্ট উল্লেখ করেন, শুল্কের মাধ্যমে রাশিয়া-কে তেল বিক্রি থেকে প্রাপ্ত আয় কমিয়ে যুদ্ধের অর্থায়ন সীমিত করা সম্ভব হবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও তার সদস্য দেশগুলো, অন্যদিকে, ভারত এ-র সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক শক্তিশালী করার জন্য মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এই চুক্তি ইউরোপীয় জোটের জন্য ভারত এ-কে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে, যা রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘর্ষের সময়ে ইউরোপের জ্বালানি সরবরাহের বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইউরোপীয় কর্মকর্তারা শুল্ক নীতির প্রতি সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেননি, তবে তারা যুক্তরাষ্ট্রের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সমাধানে সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার দাবি স্বীকার করেছেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সমাপ্তি নিয়ে প্রচেষ্টা ট্রাম্প প্রশাসনের সময় থেকে চালু। ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে তিনি যুদ্ধ তৎক্ষণাৎ শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তবে এক বছরের বেশি সময় কেটে যাওয়ার পরেও কোনো সরাসরি আলোচনার ফলাফল দেখা যায়নি। রাশিয়া ও ইউক্রেনের নেতাদের এক টেবিলে বসাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।
বেসেন্টের মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে, ইউরোপীয় জোটের মধ্যে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের আর্থিক দায়িত্ব নিয়ে বিতর্ক তীব্রতর হয়েছে। কিছু ইউরোপীয় বিশ্লেষক যুক্তি দেন, রাশিয়া থেকে তেল ক্রয়ের ওপর শুল্ক আরোপ করা ইউরোপের জন্য অর্থনৈতিক ক্ষতি বয়ে আনতে পারে, কারণ তা সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতি রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘর্ষের তহবিল কমাতে কার্যকর হতে পারে বলে অনুমান করা হয়।
ভবিষ্যতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে এই বাণিজ্যিক পার্থক্য কূটনৈতিক সম্পর্কের নতুন মোড় নিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতি যদি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের তহবিলকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়, তবে ইউরোপীয় দেশগুলোকে বিকল্প জ্বালানি উৎস খুঁজতে হবে এবং ভারত এ-র সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা করতে হতে পারে। অন্যদিকে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন যদি ভারত এ-র সঙ্গে বাণিজ্যিক সহযোগিতা বজায় রাখে, তবে রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘর্ষের আর্থিক দায়িত্বের ভাগাভাগি নিয়ে দ্বিমত অব্যাহত থাকবে।
এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতি ও নিরাপত্তা কৌশলের মধ্যে জটিল সমন্বয় দাবি করে। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপের ফলে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের আর্থিক প্রবাহে পরিবর্তন আসতে পারে, যা ইউরোপীয় জোটের কূটনৈতিক অবস্থানকে প্রভাবিত করবে। একই সঙ্গে, ভারত এ-র সঙ্গে ইউরোপের বাণিজ্যিক বন্ধন রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘর্ষের পরিপ্রেক্ষিতে নতুন কূটনৈতিক সমন্বয়ের সূচনা হতে পারে।
উল্লেখযোগ্য যে, ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েনও দিল্লিতে অনুষ্ঠিত প্রজাতন্ত্র দিবসের অনুষ্ঠানে ভারত এ-কে প্রধান অতিথি হিসেবে স্বাগত জানিয়েছেন এবং ঐতিহাসিক মুক্ত বাণিজ্যচুক্তির চূড়ান্ত ঘোষণা দিয়েছেন। এই উন্নয়ন যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতি ও ইউরোপীয় বাণিজ্যিক কৌশলের মধ্যে পারস্পরিক প্রভাবকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সংক্ষেপে, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের মন্তব্য রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের আর্থিক দায়িত্বের পুনঃবণ্টন নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনাকে তীব্র করেছে। শুল্ক নীতি, বাণিজ্যিক চুক্তি এবং কূটনৈতিক উদ্যোগের সমন্বয় ভবিষ্যতে কীভাবে গড়ে উঠবে, তা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।



