ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর গোয়েন্দা শাখা (আইআরজিসি) সোমবার একটি বিবৃতিতে জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলি সরকারের সমর্থনে ১০টি বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা সৃষ্টির পরিকল্পনা করেছিল। এই পরিকল্পনা ১২ দিনের সামরিক সংঘর্ষের সঙ্গে যুক্ত হয়ে দেশের ভূ-রাজনৈতিক অখণ্ডতা ও জাতীয় পরিচয়কে ক্ষতিগ্রস্ত করার লক্ষ্যে চালু হয়। আইআরজিসি দাবি করে, এই ষড়যন্ত্রের ফলে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর সতর্কতা এবং জনগণের সহযোগিতায় ব্যাপক গ্রেফতার এবং অস্ত্র জব্দ করা সম্ভব হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সপ্তাহে ঘটিত দাঙ্গাগুলো এক বৃহৎ কৌশলের অংশ ছিল, যার নেতৃত্বে মার্কিন সরকার এবং ইজরায়েলি সরকার ছিল। আইআরজিসি অনুসারে, এই দুই দেশের নেতৃত্বাধীন একটি কমান্ড রুম গঠন করা হয়, যেখানে দশটি বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়। এই কমান্ড রুমের কাজ ছিল দেশীয় প্রতিবাদকে উসকে দিয়ে বিদেশি হস্তক্ষেপের মাধ্যমে ইরানের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলা।
আইআরজিসি উল্লেখ করে, ১২ দিনের যুদ্ধের পরপরই শত্রু পক্ষের কমান্ড রুম সক্রিয় হয় এবং পরিকল্পিত দাঙ্গা শুরু হয়। শত্রু সংস্থাগুলোকে ইরানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কাঠামোর দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে জনসমাবেশে সহিংসতা ছড়িয়ে দেওয়া, সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সক্রিয়তা বাড়ানো এবং সামাজিক মিডিয়ায় উত্তেজনা সৃষ্টির দায়িত্ব দেওয়া হয়। এই কর্মকাণ্ডের লক্ষ্য ছিল নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে সাধারণ নাগরিকের ক্ষতি বাড়িয়ে সরকারকে দুর্বল করা।
আইআরজিসি জানায়, নিরাপত্তা বাহিনীর তীব্র তদারকি এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের ফলে এই ষড়যন্ত্রের বেশিরভাগ অংশ ব্যর্থ হয়েছে। অপারেশনের ফলস্বরূপ, অ্যান্টি-সিকিউরিটি নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত ৭৩৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এছাড়া, ১১,০০০ এরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিকে তলব করা হয়েছে এবং ৭৪৩টি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র জব্দ করা হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বিদেশি সংস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত ৪৬ জন সন্দেহভাজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। আইআরজিসি দাবি করে, এই ব্যক্তিরা বিদেশি রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি সমন্বয় করে দাঙ্গা পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে সহায়তা করছিল। তাদের কাজের মধ্যে ছিল সহিংসতা উস্কে দেওয়া, সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সদস্যদের মাঠে নামিয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ বাড়ানো এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হিংসাত্মক বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া।
আইআরজিসি জানায়, দাঙ্গাকারীদের যোগাযোগ নেটওয়ার্কে অনুপ্রবেশ করে সীমান্তবর্তী সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ভবিষ্যতে এই নেটওয়ার্কগুলোকে চিহ্নিত করে কঠোরভাবে মোকাবিলা চালিয়ে যাওয়া হবে বলে সংস্থা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এদিকে, নিরাপত্তা বাহিনীর তদারকি অব্যাহত থাকবে এবং কোনো নতুন হুমকি উদ্ভূত হলে তা দ্রুত দমন করা হবে।
ইরানে অস্থিরতা ৮ জানুয়ারি থেকে শুরু হয়, যা কয়েক দিন ধরে চলতে থাকে। আইআরজিসি অনুসারে, এই দাঙ্গার মূল কারণ ছিল ইরানি রিয়ালের অবমূল্যায়ন রোধে ব্যবসায়ীদের সরকারের নীতি পরিবর্তনের দাবি। বাজার ও বিপণিবিতানে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ থেকে শুরু হয়ে দ্রুতই বৃহৎ দাঙ্গায় রূপান্তরিত হয়।
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ইজরায়েলি সরকার ও মার্কিন সরকারের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে এই পরিকল্পনার সমর্থন প্রকাশ করেছেন। আইআরজিসি এই বক্তব্যকে বিদেশি হস্তক্ষেপের স্পষ্ট প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করেছে এবং ইরানের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি সরাসরি হুমকি হিসেবে বিবেচনা করেছে।
আইআরজিসি শেষ করে জানায়, বিদেশি প্ররোচনার মাধ্যমে সৃষ্ট দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের হস্তক্ষেপ রোধে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা হবে। সংস্থা উল্লেখ করেছে, দেশের স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য সকল সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানো হবে এবং কোনো বিদেশি গোপনচর পরিকল্পনা ধরা পড়লে তা কঠোরভাবে শাস্তি দেওয়া হবে।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন, এই বড় গ্রেফতার ও অস্ত্র জব্দের পর ইরানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নীতি কঠোর হবে এবং বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও দৃঢ় অবস্থান নেওয়া হতে পারে। তবে, ইরানের সরকারী সংস্থাগুলোর এই দাবির সত্যতা ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া এখনও স্পষ্ট নয়।



