মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার মঙ্গলবার সকালেই রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এক মতবিনিময় সভায় তামাক নিয়ন্ত্রণের ব্যাপক দায়িত্বের ওপর জোর দেন। তিনি উল্লেখ করেন, তামাক নিয়ন্ত্রণ শুধুমাত্র স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাজ নয়, এটি একটি বৃহত্তর জনস্বাস্থ্য বিষয়, যেখানে সব সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
এই সভা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের অধীনে গঠিত জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেল আয়োজন করে। আলোচনার মূল বিষয় ছিল “ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫”-এর কার্যকর বাস্তবায়ন। উপস্থিত কর্মকর্তারা নতুন বিধান প্রয়োগের কৌশল ও সময়সূচি নিয়ে মতবিনিময় করেন।
উপদেষ্টা উল্লেখ করেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর থেকে একটি ভুল ধারণা প্রচার করা হয়েছে যে তামাক নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নিলে সরকারের আয় কমে যাবে। তিনি বলেন, এই যুক্তি তামাক কোম্পানির টাকায় দেশ চলে—এই মিথ্যা ধারণা দীর্ঘদিন ধরে তামাক নিয়ন্ত্রণের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত করেছে।
তামাকজনিত রোগের কারণে প্রতি বছর স্বাস্থ্য খাতে যে বিশাল ব্যয় হয়, তা যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয় না। তিনি উল্লেখ করেন, তামাক কোম্পানির রাজস্ব নিয়ে আলোচনা হয়, কিন্তু তামাক ব্যবহারের ফলে সৃষ্ট স্বাস্থ্য ব্যয় ও সামাজিক ক্ষতি প্রায়ই উপেক্ষা করা হয়। এই অসমতা নীতি নির্ধারণে ভুল দিক নির্দেশ করে।
সরকারের শেয়ার থাকা তামাক কোম্পানির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মানুষের মৃত্যু ঘটায় এমন সংস্থায় সরকারি অংশীদারিত্বের কোনো যুক্তি নেই। বরং এসব কোম্পানিকে নিষ্ক্রিয় করে জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি রোধ করা সরকারের দায়িত্ব। এই দৃষ্টিকোণ থেকে তামাক শিল্পের কাঠামো পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন।
উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ভূমিকা উল্লেখ করে বলেন, তামাক নিয়ন্ত্রণে শুধুমাত্র আইন প্রণয়ন নয়, একটি বাস্তবসম্মত ও পূর্ণাঙ্গ রোডম্যাপ তৈরি করা জরুরি। তিনি জোর দেন, রোডম্যাপের মাধ্যমে ধাপে ধাপে লক্ষ্য নির্ধারণ ও পর্যবেক্ষণ সম্ভব হবে, যা নীতি বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা আনবে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেল যৌথভাবে এই রোডম্যাপ প্রস্তুত করেছে। পরিকল্পনায় তামাক নিয়ন্ত্রণের আইনগত কাঠামো, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, ধূমপানবিরতি কেন্দ্রের স্থাপন এবং তামাক বিক্রয়ের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণের ধাপগুলো অন্তর্ভুক্ত। এই সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি ভবিষ্যৎ নীতির ভিত্তি গড়ে তুলবে।
উপদেষ্টা বলেন, আইন সংশোধনের কাজ অন্তত বর্তমান সরকারের সময়েই শুরু করা উচিত, যাতে পরবর্তী সরকারগুলো তা ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে যেতে পারে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, তামাক নিয়ন্ত্রণে ধারাবাহিকতা না থাকলে অর্জিত অগ্রগতি দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হবে।
রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি তিনি আহ্বান জানান, যারা সত্যিকারের জনগণের মঙ্গলের জন্য কাজ করতে চায়, তাদের নির্বাচনের আগে তামাক নিয়ন্ত্রণে স্পষ্ট অঙ্গীকার করা দরকার। তিনি উল্লেখ করেন, নির্বাচনী প্রচারণায় বিনামূল্যে সিগারেট বা তামাকজাত দ্রব্য বিতরণ একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা, যা জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি বাড়িয়ে দেয়।
উল্লেখযোগ্য যে, তামাক নিয়ন্ত্রণের কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য সব মন্ত্রণালয়, বিশেষ করে অর্থ, শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। উপদেষ্টা বলেন, তামাক শিল্পের আর্থিক লাভের চেয়ে জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি বেশি, তাই নীতি নির্ধারণে স্বাস্থ্য দৃষ্টিকোণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
অবশেষে, তিনি পাঠকদের স্মরণ করিয়ে দেন, তামাকের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং সরকারকে দৃঢ় নীতি গ্রহণে উৎসাহিত করা প্রত্যেকের দায়িত্ব। তামাক নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত হবে। আপনি কি তামাকমুক্ত সমাজের জন্য আপনার ভূমিকা নিতে প্রস্তুত?



