পশ্চিম জাভার বান্ডুং বারা জেলার পাসির লাঙ্গু গ্রামে শনিবার ভোরে ভারী বৃষ্টির ফলে এক বিশাল ভূমিধস ঘটেছে। নৌবাহিনীর মতে, প্রশিক্ষণরত ২৩ জন মেরিন সৈনিকের দেহ উদ্ধার করা হয়েছে, আর একই সময়ে ৪২ জন এখনও অজানা স্থানে হারিয়ে আছে।
ভূমিধসের স্থানটি জাকার্তা থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত, যেখানে পাহাড়ি ভূখণ্ডে ধারাবাহিক বৃষ্টিপাতের ফলে মাটির স্তর অস্থিতিশীল হয়ে গিয়েছিল। ঘটনাস্থলে তৎক্ষণাৎ উদ্ধারকর্ম শুরু হয়, যেখানে নৌবাহিনীর মুখপাত্র প্রথম অ্যাডমিরাল তুঙ্গুলের নির্দেশে ৮০০ জন রেসকিউ কর্মী, সামরিক ও পুলিশ সদস্য এবং নয়টি এক্সকাভেটর মোতায়েন করা হয়েছে।
মেরিন সৈন্যরা ইন্দোনেশিয়া-পাপুয়া নিউ গিনি সীমান্ত টহল প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে ওই অঞ্চলে অবস্থান করছিল। তুঙ্গুল জানান, “দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া এবং অব্যাহত বৃষ্টিপাতের মধ্যে প্রশিক্ষণ শিবিরে ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে।”
ইন্দোনেশিয়ার দুর্যোগ প্রশমণ সংস্থার মুখপাত্র আব্দুল মুহারির মতে, মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ১৭ থেকে ২০ এর মধ্যে পরিবর্তিত ছিল, তবে পরবর্তী তদন্তে নিশ্চিত করা হয়েছে যে ২৩ জন সৈনিকের দেহ উদ্ধার হয়েছে। একই সঙ্গে, ৪২ জনের অবস্থা এখনও অজানা, তাই তাদের সন্ধানে তীব্র অনুসন্ধান চালু রয়েছে।
পাসির লাঙ্গু গ্রামের ৬৮৫ জন বাসিন্দা নিরাপত্তার জন্য স্থানীয় সরকারি ভবনে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। এই স্থানান্তরটি তীব্র বৃষ্টির কারণে বাড়ি ধসে যাওয়া ও সড়ক বন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে জরুরি পদক্ষেপ হিসেবে নেওয়া হয়েছে।
এই ঘটনা জাভা দ্বীপে চলমান মৌসুমী বৃষ্টিপাতের ধারাবাহিকতা এবং সাম্প্রতিক বন্যার সঙ্গে যুক্ত। গত সপ্তাহে রাজধানী জাকার্তা এবং পশ্চিম ও মধ্য জাভার বিভিন্ন শহরে বন্যা দেখা গিয়েছিল, যা বহু পরিবারকে প্রভাবিত করেছে। দুই মাস আগে ঘূর্ণিঝড়ের পর সুমাত্রা দ্বীপে সৃষ্ট বন্যা ও ভূমিধসে প্রায় ১২০০ জনের মৃত্যু এবং এক লক্ষের বেশি মানুষ স্থানচ্যুত হয়েছিল।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও মানবিক সহায়তার দৃষ্টিকোণ থেকে, ইন্দোনেশিয়া এই ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে। দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন বিশ্লেষক উল্লেখ করেছেন, “ইন্দোনেশিয়া ASEAN সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ক্ষেত্রে সমন্বয় বাড়াতে চায়, বিশেষ করে প্রশিক্ষণ, সরঞ্জাম শেয়ারিং এবং ত্রাণ সামগ্রী সরবরাহে।”
ইউনাইটেড নেশনসের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসের জন্য দায়িত্বশীল সংস্থা (UNDRR) ইতিমধ্যে ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে সমন্বয় করে অতিরিক্ত রেসকিউ টিম ও মেডিকেল সাপোর্ট পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। সংস্থার প্রতিনিধি বলেন, “এই ধরনের বড় আকারের ভূমিধসের পরিপ্রেক্ষিতে দ্রুত ত্রাণ ও চিকিৎসা সেবা প্রদান করা অপরিহার্য, এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ।”
অধিকন্তু, ইন্দোনেশিয়ার সামরিক বাহিনী এই ঘটনার পর প্রশিক্ষণ প্রোটোকল পুনর্বিবেচনা করার পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। সামরিক বিশ্লেষক রায়ান সুলতানের মতে, “সীমান্ত টহল প্রশিক্ষণ এলাকায় প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বিবেচনা করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা দরকার, যাতে ভবিষ্যতে অনুরূপ ঘটনা রোধ করা যায়।”
স্থানীয় প্রশাসন এবং জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা (BNPB) এখনো নিখোঁজদের সন্ধানে তীব্র অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে। সন্ধানকাজে স্যাটেলাইট চিত্র, ড্রোন এবং ভূগর্ভস্থ রাডার ব্যবহার করা হচ্ছে, যাতে দ্রুততম সময়ে হারিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের অবস্থান নির্ণয় করা যায়।
অবশেষে, ইন্দোনেশিয়ার সরকার এই দুর্যোগের ফলে প্রভাবিত পরিবারগুলোর জন্য আর্থিক সহায়তা এবং পুনর্নির্মাণ পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। সরকারী সূত্রে বলা হয়েছে, “প্রভাবিত পরিবারগুলোকে ত্রাণ সামগ্রী, অস্থায়ী আশ্রয় এবং পুনর্নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় তহবিল সরবরাহ করা হবে।”
এই ভূমিধসের পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি ইন্দোনেশিয়ার দুর্যোগ প্রস্তুতি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় কীভাবে সমন্বিত পদক্ষেপ নেবে, তা দিকে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। ASEAN সদস্য দেশগুলো ইতিমধ্যে পরবর্তী সমন্বিত প্রশিক্ষণ সেশনের পরিকল্পনা করছে, যাতে ভবিষ্যতে একই ধরনের বিপর্যয় কমিয়ে আনা যায়।



