অর্থবছরের ছয় মাস অতিক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিশদ বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয়েছে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার বহু সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের পরেও মুদ্রাস্ফীতি, রপ্তানি ও রাজস্ব সংগ্রহে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। একই সঙ্গে জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি চলায় নতুন সরকার কীভাবে অর্থনীতিকে পরিচালনা করবে, তা নিয়ে অনুমান বাড়ছে।
অন্তর্বর্তী সরকার গত বছর থেকে কর সংগ্রহের কাঠামো শক্তিশালী করা, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা এবং সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে নানা সংস্কার চালু করেছে। তবে এই সংস্কারগুলো সম্পূর্ণ কার্যকর না হওয়ায় মুদ্রাস্ফীতি ও বেকারত্বের চাপ এখনও কমেনি। বিশেষ করে রপ্তানি খাতে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প সরকারের পাল্টা শুল্কের প্রভাব স্পষ্ট, যা রপ্তানি আয়কে হ্রাস করেছে।
আসন্ন জাতীয় নির্বাচন দেশের অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করবে বলে বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন। নতুন সরকার গৃহীত নীতি কীভাবে বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করবে, তা নিয়ে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি দেখা যাচ্ছে। তবে বর্তমান সময়ে মুদ্রাস্ফীতি ও রপ্তানি সংকটের সমাধানই অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মুদ্রাস্ফীতি এখনও তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে, বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের দামের উত্থান মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতি রপ্তানি খাতকে চাপের মধ্যে ফেলেছে, ফলে রপ্তানি আয় পূর্বের তুলনায় হ্রাস পেয়েছে। অন্যদিকে, প্রবাসী থেকে প্রাপ্ত রেমিট্যান্সের প্রবাহ স্থিতিশীল এবং কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
রাজস্ব সংগ্রহের হার এখনও লক্ষ্যিত স্তরে পৌঁছায়নি, ফলে সরকারি ব্যয় পরিকল্পনা প্রভাবিত হচ্ছে। বেসরকারি খাতে ঋণ বৃদ্ধি ও রাজস্ব সংগ্রহের দুর্বলতা বিনিয়োগের পরিবেশকে অস্থির করেছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে নতুন উদ্যোগের অভাব দেখা যাচ্ছে, যা বেকারত্বের হারকে উচ্চ রাখছে।
অর্থবছরের অর্ধেক পর দেশের অর্থনৈতিক চিত্রকে মিশ্র অবস্থায় বলা যায়। একদিকে জিডিপি বৃদ্ধি, রেমিট্যান্সের প্রবাহ এবং বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভে সামান্য উন্নতি লক্ষ করা যায়; অন্যদিকে মুদ্রাস্ফীতি ও রপ্তানি আয়ের হ্রাস অর্থনীতিকে চাপের মধ্যে রাখছে। এই দ্বৈত দিকই বর্তমান সময়ের মূল বৈশিষ্ট্য।
খাদ্যপণ্যের দামের উত্থান মুদ্রাস্ফীতির প্রধান কারণ হিসেবে রয়ে গেছে। যদিও মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি কিছুটা স্থিতিশীল, তবু বেসরকারি খাতে ঋণ বৃদ্ধি ও রাজস্ব সংগ্রহের অবনতি উদ্বেগের বিষয়। রপ্তানি আয়ও পূর্বের তুলনায় হ্রাস পেয়েছে, যা বাণিজ্য ঘাটতি বাড়িয়ে তুলেছে।
চালের দামের পরিবর্তন সাধারণ মানুষের জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলে। ডিসেম্বর মাসে চালের মূল্যস্ফীতি ১১.৯২ শতাংশে নেমে এসেছে, যা নভেম্বরের ১২.২৬ শতাংশের তুলনায় হ্রাস পেয়েছে। সব ধরনের চাল—চিকন, মাঝারি ও মোটা—এর দামে সামান্য কমতি দেখা গেছে, তবে দামের বৃদ্ধির গতি এখনও স্বস্তি দেয়ার মতো নয়।
চালের দামের ওঠানামা সামগ্রিক মুদ্রাস্ফীতিতে প্রায় ২২ থেকে ২৫ শতাংশের অবদান রাখে। তাই চালের দাম বাড়লে পুরো মূল্যস্ফীতি তীব্র হয়, আর দাম কমলে মুদ্রাস্ফীতি কিছুটা শমিত হয়। চালসহ অন্যান্য খাদ্যপণ্যের দামের পরিবর্তনই মুদ্রাস্ফীতির প্রধান চালক হিসেবে কাজ করে।
বিগত এক বছর জুড়ে মুদ্রাস্ফীতি একাধিকবার পরিবর্তন হয়েছে। ডিসেম্বর মাসে মাসিক মুদ্রাস্ফীতি ৮.৪৯ শতাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে, যদিও পূর্বের কয়েক মাসে এক অঙ্কের সীমার মধ্যে ছিল। তবে এই স্তর এখনও সহনীয় সীমার উপরে, যা ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতাকে প্রভাবিত করছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বরে খাদ্যমূল্যের মুদ্রাস্ফীতি ৭.৭১ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মুদ্রাস্ফীতি ৯.১৩ শতাংশ রেকর্ড করা হয়েছে। এই সংখ্যা নির্দেশ করে যে খাদ্য ও অখাদ্য পণ্যের দামের উত্থান উভয়ই মুদ্রাস্ফীতির চাপ বাড়িয়ে তুলছে, ফলে নীতি নির্ধারকদের জন্য সমন্বিত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে।



