ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ভারত এ আজ (মঙ্গলবার) নতুন দিল্লিতে এক ঐতিহাসিক বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যা দুই দশকের আলোচনার পর শেষ হয়েছে। এই চুক্তি, যা নরেন্দ্র মোদি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে সমঝোতা হয়েছে, উভয় পক্ষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও প্রতিযোগিতামূলকতা বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে গৃহীত হয়েছে।
চুক্তি স্বাক্ষরের সময় নরেন্দ্র মোদি উল্লেখ করেন যে, বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতার মুখে এই চুক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা দেবে। তিনি এটিকে “সবচেয়ে বড় চুক্তি” বলে বর্ণনা করেন এবং এটির মাধ্যমে ভারত এ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের ১.৪ বিলিয়ন মানুষ ও লক্ষ লক্ষ ইউরোপীয় নাগরিকের জন্য নতুন সুযোগের দরজা খুলে যাবে বলে আশাবাদ প্রকাশ করেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের কমিশন প্রেসিডেন্ট উর্সুলা ভন ডের লেয়েন এবং ইউরোপীয় কাউন্সিল প্রেসিডেন্ট অ্যান্টোনিও কোস্টা নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। উভয় পক্ষের আলোচনার মূল বিষয় ছিল বাণিজ্যিক বাধা হ্রাস, প্রযুক্তি বিনিময় এবং অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানো।
চুক্তির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এটি বৈশ্বিক মোট দেশীয় উৎপাদনের প্রায় ২৫ শতাংশ এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের এক-তৃতীয়াংশকে প্রতিনিধিত্ব করে। এই পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে, উভয় পক্ষের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়বে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যা পূর্বে ভারত এ-কে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজার হিসেবে দেখেছে, এই চুক্তির মাধ্যমে তার পণ্য ও সেবার প্রবেশাধিকার বাড়াতে চায়। বিশেষ করে গাড়ি, ওয়াইন এবং অন্যান্য উচ্চ মানের পণ্যের রপ্তানি সহজতর হবে, যা ইউরোপীয় উৎপাদকদের জন্য নতুন বাজার খুলে দেবে।
অন্যদিকে, ভারত এ ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রযুক্তি, বিনিয়োগ এবং দক্ষতা থেকে উপকৃত হবে। নরেন্দ্র মোদি উল্লেখ করেন যে, এই চুক্তি ভারত এ-কে অবকাঠামো উন্নয়ন, ডিজিটাল রূপান্তর এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ত্বরান্বিত করবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দু’দেশের পণ্য বাণিজ্য ১২০ বিলিয়ন ইউরো (প্রায় ১৩৯ বিলিয়ন ডলার) পৌঁছেছে, যা গত দশকে প্রায় ৯০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। সেবার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ৬০ বিলিয়ন ইউরো (প্রায় ৬৯ বিলিয়ন ডলার) বাণিজ্য হয়েছে। এই বৃদ্ধির ধারাকে চুক্তি আরও ত্বরান্বিত করবে বলে উভয় পক্ষের প্রত্যাশা।
উর্সুলা ভন ডের লেয়েন উল্লেখ করেন যে, ভারত এ-তে ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য সর্বোচ্চ প্রবেশাধিকার প্রদান করা হবে, যা পূর্বে কখনো না দেখা এক স্তরের সুবিধা। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, রপ্তানি পরিমাণ দ্বিগুণ হবে এবং শিল্প ও কৃষি পণ্যের ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়ন উল্লেখযোগ্য প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা পাবে।
নরেন্দ্র মোদি চুক্তির মাধ্যমে ভারত এ-র টেক্সটাইল ও ফার্মাসিউটিক্যাল সেক্টরের রপ্তানি সহজতর হবে বলে জানান। এ ধরনের পণ্য ইউরোপীয় বাজারে সহজে প্রবেশ পাবে, যা উভয় দেশের শিল্পের বিকাশে সহায়তা করবে।
চুক্তি স্বাক্ষরের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতারা সোমবারের প্রজাতন্ত্র দিবসের প্যারেডে ভারত এ-র গৌরবময় অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করেন এবং মঙ্গলবার সকালে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে পুনরায় বৈঠক করেন। এই অনুষ্ঠানগুলো দুই দেশের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের গভীরতা বাড়ানোর লক্ষ্যে পরিচালিত হয়।
বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, এই চুক্তি ভবিষ্যতে উভয় পক্ষের বাণিজ্যিক পরিমাণকে দ্বিগুণের কাছাকাছি নিয়ে যাবে এবং নতুন শিল্পখাতের উন্মোচন ঘটাবে। তবে, বাজারে প্রবেশের সময় নিয়ন্ত্রক বাধা ও মানদণ্ডের পার্থক্য মোকাবিলার জন্য উভয় দেশকে সমন্বিত নীতি গ্রহণ করতে হবে।
সারসংক্ষেপে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ভারত এ-র এই বৃহৎ বাণিজ্য চুক্তি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক দৃশ্যপটে নতুন দিকনির্দেশনা তৈরি করবে, যা উভয় দেশের শিল্প, কর্মসংস্থান এবং বিনিয়োগের পরিবেশকে শক্তিশালী করবে।



