২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জাতীয় নির্বাচনের জন্য স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের সর্ববৃহৎ দল গঠন করা হয়েছে, যা ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর থেকে সর্বোচ্চ সংখ্যা। এই পর্যবেক্ষকগণ নাগরিক সংগঠন থেকে শুরু করে অভিজ্ঞ আন্তর্জাতিক মিশন পর্যন্ত বিস্তৃত, যা দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি বাড়তি আগ্রহ ও সতর্কতা নির্দেশ করে।
ইলেকশন কমিশনারের মতে, ৮১টি নিবন্ধিত স্থানীয় সংস্থা থেকে মোট ৫৫,৪৫৪ জন পর্যবেক্ষক দায়িত্বে থাকবে, আর প্রায় ৫০০ বিদেশি পর্যবেক্ষকও ভোটগ্রহণে অংশ নেবে। এই সংখ্যা ২০০৮ সালের নির্বাচনের সময়ের ১,৫৯,১১৩ স্থানীয় ও ৫৯৩ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি নির্দেশ করে।
পর্যবেক্ষকদের কাজ শুধুমাত্র ভোটের দিনই সীমাবদ্ধ নয়; স্বল্পমেয়াদী পর্যবেক্ষকরা ভোটগ্রহণ ও গণনা পর্যবেক্ষণ করেন, আর দীর্ঘমেয়াদী আন্তর্জাতিক দলগুলো প্রস্তুতি, আইনগত কাঠামো, প্রচারাভিযানের আচরণ এবং বিরোধ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করে। এভাবে তারা পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায়পরায়ণতা নিশ্চিত করতে সহায়তা করে।
ইলেকশন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) আবুল ফজল মোঃ সানাউল্লাহের উল্লেখে, ৫৫,৪৫৪ স্থানীয় পর্যবেক্ষকের পাশাপাশি প্রায় ৫০০ বিদেশি পর্যবেক্ষক ভোটের দিন উপস্থিত থাকবে। তিনি জানান, এই বিশাল দল নির্বাচন প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপের ওপর নজরদারি করবে।
২০০৮ সালের নির্বাচনে মোট ১,৫৯,১১৩ স্থানীয় এবং ৫৯৩ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক অংশগ্রহণ করেছিল, যা তখনের সর্বোচ্চ পর্যবেক্ষক উপস্থিতি হিসেবে রেকর্ড হয়েছিল। এখন এই সংখ্যা নতুন রেকর্ডের কাছাকাছি, যা দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
ভোট বিশ্লেষক বাদুল আলম মজুমদার, যিনি পূর্বে ইলেকটোরাল রিফর্ম কমিশনের প্রধান ছিলেন, উল্লেখ করেন যে প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন হওয়ায় পর্যবেক্ষকদের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। তিনি বলেন, পূর্বের তিনটি নির্বাচনে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা কম সক্রিয় ছিলেন, কারণ সেগুলো প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ছিল না।
মজুমদার আরও জানান, অতীতে কিছু আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ভিসা প্রত্যাখ্যানের মতো বাধার সম্মুখীন হয়েছেন, যা তাদের উপস্থিতি সীমিত করেছিল। তবে এবার এমন বাধা কমে যাওয়ায় পর্যবেক্ষক সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাংলাদেশে সংসদীয় নির্বাচন প্রতি পাঁচ বছর পরপর অনুষ্ঠিত হয়, তবে এই নির্বাচন পূর্বের নির্বাচনের মাত্র দুই বছর পরই অনুষ্ঠিত হচ্ছে। কারণ ২০০৮ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ শাসনের পতনের পর সরকার পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
আওয়ামী লীগ ২০০৮ থেকে ধারাবাহিকভাবে শাসন চালিয়ে আসছিল, তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে নতুন শাসন কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। এই পরিবর্তন নির্বাচনের সময়সূচি দুবছর আগে সরিয়ে আনার মূল কারণ।
২০১৪ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে প্রায় সব বিরোধী দল অংশগ্রহণ থেকে বিরত ছিল, ফলে সেগুলোকে একতরফা নির্বাচন হিসেবে সমালোচনা করা হয়। এই পরিস্থিতি নির্বাচনের বৈধতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
বিরোধী দলের ব্যাপক বয়কটের ফলে সংসদে ১৫৩টি আসনও শূন্য রয়ে গিয়েছিল, যা দেশের রাজনৈতিক সমতা ও প্রতিনিধিত্বের ওপর প্রভাব ফেলেছে। এই অভাব ভবিষ্যতে রাজনৈতিক সংলাপের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
বিশাল পর্যবেক্ষক দল গঠন এবং আন্তর্জাতিক নজরদারির বৃদ্ধি নির্বাচনের ফলাফলকে অধিক স্বচ্ছ ও ন্যায়সঙ্গত করার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে, ভোটের পূর্ব প্রস্তুতি, আইনগত প্রয়োগ এবং বিরোধ নিষ্পত্তি প্রক্রিয়ায় পর্যবেক্ষকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
পরবর্তী সময়ে নির্বাচন কমিশন পর্যবেক্ষকদের রিপোর্ট বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় সংশোধনী পদক্ষেপ গ্রহণের পরিকল্পনা করছে। এছাড়া, ফলাফল ঘোষণার পরেও পর্যবেক্ষক দলগুলো ফলাফল যাচাই ও সম্ভাব্য বিরোধ সমাধানে সহায়তা করবে।
সারসংক্ষেপে, ২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকের বিশাল উপস্থিতি দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি বাড়তি মনোযোগ ও স্বচ্ছতার ইচ্ছা প্রকাশ করে। এই পর্যবেক্ষক দলগুলো নির্বাচনের প্রতিটি ধাপের ওপর নজর রাখবে, যা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জনসাধারণের আস্থা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।



