ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশন (আইওএম) গত দশ দিনে ভূমধ্যসাগরে ঘটিত একাধিক জাহাজডুবি ঘটনার ফলে শত শত অভিবাসী নিখোঁজ বা প্রাণ হারিয়েছেন বলে জানিয়েছে। এই তথ্য জাতিসংঘের অধীনস্থ সংস্থার এক অফিসিয়াল বিবৃতিতে প্রকাশিত হয়েছে।
বর্ণিত ঘটনাগুলি সবই খারাপ আবহাওয়ার মধ্যে ঘটেছে, যেখানে তিউনিসিয়ার স্ফ্যাক্স শহর থেকে রওনা হওয়া এক নৌকা ডুবে যাওয়ার পর তল্লাশি ও উদ্ধার অভিযান চালানো হয়। উদ্ধারকাজে বেঁচে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে এক বছর বয়সী দুই যমজ শিশুর মা গিনিয়া থেকে এসেছেন, যাঁর সন্তান দুজন হাইপোথার্মিয়ার কারণে মারা গেছে।
আইওএমের মতে, ডুবে যাওয়া নৌকায় মোট তিনজনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে যমজ শিশুরা এবং হাইপোথার্মিয়া থেকে আক্রান্ত এক পুরুষ অন্তর্ভুক্ত। বেঁচে থাকা মা জানান, তার সন্তানদের শীতল পানিতে দীর্ঘ সময় থাকার ফলে শারীরিক তাপমাত্রা হ্রাস পেয়ে মৃত্যুর কারণ হয়েছে।
এই ডুবে যাওয়া নৌকা ইতালির ল্যাম্পেডুজা দ্বীপে পৌঁছায়, যেখানে ইতালীয় কর্তৃপক্ষ দ্রুত উদ্ধার ও চিকিৎসা সেবা প্রদান করে। তবে শোকের সংবাদটি ইতালীয় শরণার্থী নীতি নিয়ে চলমান বিতর্ককে তীব্রতর করেছে।
আইওএমের এক মুখ্য কর্মকর্তা উল্লেখ করেছেন, “চূড়ান্ত মৃত্যুর সংখ্যা সম্ভবত আরও বেশি হতে পারে, যা এই রুটকে বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী অভিবাসন করিডোর হিসেবে চিহ্নিত করে।” এই মন্তব্যটি আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের শরণার্থী ও অভিবাসন নীতি সমন্বয় করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ইউরোপীয় কমিশনের একজন বিশ্লেষক মন্তব্য করেন, “মেডিটেরেনিয়ান পারাপার রুটে ঘটিত এই ধারা দেখায় যে নিরাপদ ও মানবিক সমাধান এখনই জরুরি।” তিনি আরও বলেন, দীর্ঘমেয়াদী সমাধান ছাড়া এই ধরনের ঘটনা পুনরাবৃত্তি হবে।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (UNHCR) ইতোমধ্যে এই ঘটনাকে মানবিক সংকটের অংশ হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ত্বরিত সহায়তা প্রদান করার আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থার মতে, শরণার্থী ও অভিবাসীদের নিরাপদ রুট নিশ্চিত করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ নৌকায় ভ্রমণ কমানো জরুরি।
ইতালীয় সরকার ইতোমধ্যে ল্যাম্পেডুজা দ্বীপে অতিরিক্ত সিভিল ডিফেন্স ইউনিট মোতায়েন করেছে এবং শরণার্থী ক্যাম্পে চিকিৎসা সেবা বাড়ানোর পরিকল্পনা জানিয়েছে। একই সঙ্গে, ইতালির অভ্যন্তরীণ মন্ত্রণালয় জাহাজডুবি প্রতিরোধে সমুদ্র পর্যবেক্ষণ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তিউনিসিয়ার সরকারও এই ঘটনার পর সমুদ্র নিরাপত্তা বাড়াতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তিউনিসিয়ার মন্ত্রিপরিষদের একজন সদস্য উল্লেখ করেন, “আমরা আমাদের উপকূলীয় নিরাপত্তা শক্তিশালী করব এবং শরণার্থী রুটে মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করব।”
অভিবাসন রুটের নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আফ্রিকান ইউনিয়নের মধ্যে একটি জরুরি বৈঠক নির্ধারিত হয়েছে। এই বৈঠকে সমুদ্র নিরাপত্তা, রেসকিউ অপারেশন এবং শরণার্থী রিফিউজি প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা হবে।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, ভূমধ্যসাগরে আবহাওয়ার অস্থিরতা এবং নৌকা নিরাপত্তা মানের অভাব একত্রে এই ধরনের মানবিক বিপর্যয় ঘটাচ্ছে। তারা সুপারিশ করেন, আন্তর্জাতিক নৌকা নির্মাণ মানদণ্ড অনুসরণ এবং শরণার্থী রুটে নিরাপদ নৌকা ব্যবহার নিশ্চিত করা উচিত।
সর্বশেষে, আইওএমের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত নিখোঁজ ও মৃতের মোট সংখ্যা কয়েকশোতে পৌঁছেছে, তবে চূড়ান্ত সংখ্যা এখনও নির্ধারণ করা হয়নি। সংস্থা পুনরায় বলেছে, এই রুটে নিরাপত্তা বাড়াতে ত্বরিত আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা অপরিহার্য।



