বাংলাদেশে নতুন শিল্প-কারখানা গঠনের হার কমে যাওয়ায় কর্মসংস্থান স্থবির রয়েছে এবং ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ উদ্যোক্তাদের আস্থা ক্ষয় করেছে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাজুক হওয়ায় ব্যবসা চালানোর পরিবেশ অনুকূল নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মূলধনের একটি বড় অংশ প্রতিবেশী দেশে সরে যাচ্ছে।
অর্থনীতিবিদ ও শিল্প সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা জানান, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি ডলার সংকটের ফলে উদ্যোক্তারা নিরাপদ বিনিয়োগের সন্ধানে বিদেশের দিকে ঝুঁকছেন। একই সঙ্গে, কিছু ব্যবসা মালিক চুরি করা অর্থকে বৈধ বিনিয়োগের রূপ দিতে চেষ্টা করছেন। বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, যদি বিদেশে করা বিনিয়োগের মুনাফা দেশে ফিরে আসে, তবে তা দেশের জন্য উপকারী হতে পারে।
আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচেম) সভাপতি সৈয়দ এরশাদ আহমেদ বলেন, ব্যবসা চালাতে হলে পরিবেশ অনুকূল হতে হবে; না হলে ব্যবসায়ীরা লাভের সন্ধানে বিদেশে বিনিয়োগ করবে। তিনি যোগ করেন, বিদেশে বিনিয়োগ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, তবে লভ্যাংশ দেশে না ফিরলে তা অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর সংকেত।
অ্যামচেমের মতে, ব্যবসায়ীরা বর্তমান পরিস্থিতি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসলে সিদ্ধান্ত নেবেন। বৈধ পথে বিদেশে বিনিয়োগ করা অনেকেই তৈরি পোশাকসহ রপ্তানিনির্ভর খাতে যুক্ত আছেন। পোশাক শিল্পে চলমান অস্থিরতা তাদেরকে নিরাপদ বাজারে পুঁজি স্থানান্তর করতে উদ্বুদ্ধ করেছে।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্য এর সাবেক পরিচালক এবং ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মহিউদ্দিন রুবেল জানান, যারা এই খাতে বড় লগ্নি রেখেছেন, তারা এখন কম খরচ, বেশি নিশ্চয়তা পাওয়া দেশের বাইরে বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকছেন। তিনি জোর দেন, দেশের বিনিয়োগ পরিবেশে যে সমস্যাগুলি রয়েছে, সেগুলি অগ্রাধিকার দিয়ে সমাধান করা প্রয়োজন।
বিদেশে বাংলাদেশিদের মোট বিনিয়োগের সর্ববৃহৎ অংশ ভারত থেকে এসেছে, যার পরিমাণ ১০ কোটি ৫৩ লাখ ডলার। দ্বিতীয় স্থানে যুক্তরাজ্য রয়েছে, যেখানে বিনিয়োগ ১০ কোটি ২১ লাখ ডলার। হংকংতে সাত কোটি ৯৮ লাখ ডলার, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ছয় কোটি ১৩ লাখ ডলার এবং মালয়েশিয়ায় এক কোটি ২০ লাখ ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছে। এই পরিসংখ্যান দেখায়, দেশীয় পুঁজি বিদেশে স্থানান্তরিত হওয়ায় স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রভাব পড়ছে।
বিনিয়োগের এই প্রবণতা দেশের জন্য দু’ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। একদিকে, বিদেশে পুঁজি সঞ্চয় করে রপ্তানির মাধ্যমে মুনাফা অর্জন করা সম্ভব, অন্যদিকে, যদি মুনাফা দেশে ফিরে না আসে, তবে তা বেকারত্ব ও আর্থিক ঘাটতির দিকে ধাবিত হতে পারে। তাই, সরকারকে বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা, সুদের হার কমানো এবং আইন-শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার জন্য ত্বরিত পদক্ষেপ নিতে হবে।
সারসংক্ষেপে, বর্তমান রাজনৈতিক ও আর্থিক অস্থিরতা উদ্যোক্তাদের বিদেশি বাজারে পুঁজি স্থানান্তর করতে প্ররোচিত করছে, যা দেশের শিল্পখাতের বিকাশে বাধা সৃষ্টি করছে। বিনিয়োগের সমস্যাগুলি সমাধান না হলে, বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ বাড়তে থাকবে এবং দেশের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা হ্রাস পাবে।



