টেলেনর, নরওয়ের প্রধান টেলিকম কোম্পানি, সাম্প্রতিক মাসে এশিয়ার বাজারে তার উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছে। পাকিস্তানে পরিচালিত তার ব্যবসা বিক্রি করা সম্পন্ন করেছে এবং থাইল্যান্ডে শেয়ার বিক্রয়ের চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এ পদক্ষেপের ফলে কোম্পানি এখন কেবল মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশে, যেখানে গ্রামীণফোনের মাধ্যমে প্রায় তিন দশক আগে এশিয়ায় প্রবেশ করেছিল, তার কার্যক্রম বজায় রেখেছে।
পাকিস্তান থেকে প্রস্থান দুই বছর আগে ঘোষিত হয়েছিল, তবে শেষ পর্যন্ত বিক্রয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর টেলেনর এশিয়ার বাজারে তার অংশীদারিত্ব হ্রাস করেছে। একই সময়ে থাইল্যান্ডে তার শেয়ার বিক্রয়ের চুক্তি স্বাক্ষর করে, কোম্পানি আর কোনো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশে সক্রিয় নয়। এই দুইটি লেনদেন টেলেনরের এশিয়ায় দীর্ঘমেয়াদী কৌশল পুনর্বিবেচনার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাকি থাকা দুটি বাজার—মালয়েশিয়া এবং বাংলাদেশ—টেলেনরের এশিয়ায় একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ উপস্থিতি রয়ে গেছে। বাংলাদেশে টেলেনর গ্রামীণফোনের 55.8 শতাংশ শেয়ার ধারণ করে, যা দেশের বৃহত্তম মোবাইল অপারেটরগুলোর একটি। এই শেয়ারহোল্ডিং টেলেনরের জন্য কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে, তবে সাম্প্রতিক বিবৃতি থেকে দেখা যায় যে ভবিষ্যতে এই সম্পদও বিক্রয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
কোম্পানির আর্থিক প্রধান টরবিয়র্ন উইস্ট উল্লেখ করেছেন যে, এশিয়ার সম্পদ, গ্রামীণফোনসহ, সম্ভাব্য লেনদেনের আওতায় আসতে পারে। তিনি এ বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা উল্লেখ না করেও ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেছিলেন। একইভাবে টেলেনর এশিয়ার প্রধান জোন ওমুন্ড রেভহগও বাংলাদেশের ব্যবসা সম্পর্কে একই দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেছেন, তিনি বলেছিলেন যে, গ্রাহক সেবা ও বাজারে সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে কাজ চালিয়ে যাবে যতক্ষণ না নতুন কোনো সুযোগ উদ্ভব হয়।
এই মন্তব্যগুলো টেলেনরের শীর্ষ কর্মকর্তাদের প্রথমবারের মতো গ্রামীণফোনকে সম্ভাব্য বিক্রয়ের বিষয় হিসেবে উন্মুক্ত করেছে। পূর্বে টেলেনরের প্রাক্তন সিইও সিগভে ব্রেকের এপ্রিল ২০২৪-এ প্রকাশিত বক্তব্যে কোম্পানির বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদী প্রতিশ্রুতি জোর দিয়ে বলা হয়েছিল। তবে এখন কোম্পানি তার এশিয়ার সম্পদ পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় নতুন দৃষ্টিকোণ গ্রহণ করেছে।
টেলেনরের এই কৌশলগত পরিবর্তন এশিয়ার টেলিকম সেক্টরে বিনিয়োগের পরিবেশের পরিবর্তনকে প্রতিফলিত করে। পাকিস্তান ও থাইল্যান্ডে বাজারের চ্যালেঞ্জ, নিয়ন্ত্রক পরিবেশ এবং মুনাফার হার কমে যাওয়া সম্ভবত কোম্পানির সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছে। অন্যদিকে, মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশে গ্রাহক ভিত্তি শক্তিশালী এবং আয় বৃদ্ধি ধারাবাহিক, যা টেলেনরের অবশিষ্ট এশিয়ান পোর্টফোলিওকে সমর্থন করে।
গ্রামীণফোনের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনিশ্চয়তা বাজারে কিছু উদ্বেগ তৈরি করেছে। শেয়ারহোল্ডার এবং বিনিয়োগকারীরা এখন টেলেনরের সম্ভাব্য বিক্রয় পরিকল্পনা, মূল্যায়ন মানদণ্ড এবং নতুন অংশীদারিত্বের প্রভাব সম্পর্কে মনোযোগ দিচ্ছেন। তবে টেলেনর এখনও বাংলাদেশে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে, যা গ্রাহক সেবা এবং নেটওয়ার্ক উন্নয়নে ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে।
বাজার বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন যে, টেলেনরের এশিয়ার সম্পদ হ্রাসের ফলে কোম্পানির গ্লোবাল আর্থিক কাঠামো আরও সুনির্দিষ্ট হবে এবং মূল ব্যবসায়িক ক্ষেত্রগুলোতে মনোযোগ কেন্দ্রীভূত হবে। একই সঙ্গে, গ্রামীণফোনের সম্ভাব্য বিক্রয় বা অংশীদারিত্ব পরিবর্তন দেশের টেলিকম শিল্পের কাঠামোতে নতুন গতিবিধি আনতে পারে।
সারসংক্ষেপে, টেলেনর এশিয়ায় তার উপস্থিতি সংকুচিত করে পাকিস্তান ও থাইল্যান্ড থেকে বেরিয়ে এসেছে, এবং এখন শুধুমাত্র মালয়েশিয়া ও গ্রামীণফোনের মাধ্যমে বাংলাদেশে তার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। কোম্পানি ভবিষ্যতে গ্রামীণফোনকে সম্ভাব্য লেনদেনের অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে পারে, তবে বর্তমান সময়ে ব্যবসা স্বাভাবিকভাবে চালিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। এই পরিস্থিতি টেলিকম সেক্টরের বিনিয়োগ, অংশীদারিত্ব এবং বাজার গতিবিধিতে নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করবে।



