টোকিওর একটি আদালত সোমবার চারজনকে ৮৮ মিলিয়ন জাপানি ইয়েন (প্রায় ৫৭০,০০০ ডলার) ক্ষতিপূরণ আদেশ করেছে, যারা দশক আগে উত্তর কোরিয়ায় প্রোপ্রাগান্ডা পরিকল্পনার মাধ্যমে প্রলুব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। আদালত জোর দিয়েছে যে উত্তর কোরিয়ার এই প্রলুব্ধকরণ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অন্তর্ভুক্ত।
এই রায় মূলত প্রতীকী, কারণ উত্তর কোরিয়া দীর্ঘদিন ধরে জাপানি আদালতের আদেশকে অগ্রাহ্য করেছে এবং তার নেতা কিম জং উন কোনো সমন召ে সাড়া দেননি। তাই আদায়ের বাস্তবিক পথ এখনো অনিশ্চিত, তবে রায়টি আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।
শিকায়ের দল দাবি করে যে তাদেরকে উত্তর কোরিয়াকে “পৃথিবীর স্বর্গ” হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল, কিন্তু বাস্তবে তারা কঠোর শর্তের মধ্যে বাধ্যতামূলক শ্রমে নিযুক্ত হয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে পালাতে সক্ষম হয়েছেন। তাদের বর্ণনা অনুযায়ী, প্রাথমিক প্রতিশ্রুতি ছিল বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থান, যা বাস্তবে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল।
১৯৫৯ থেকে ১৯৮৪ সালের মধ্যে ৯০,০০০েরও বেশি জাইনিচি কোরিয়ান, অর্থাৎ জাপানে বসবাসকারী কোরিয়ান বংশোদ্ভূতরা, উত্তর কোরিয়ার পুনর্বাসন প্রকল্পের আওতায় দেশান্তরিত হয়েছিলেন। এই প্রকল্পটি উত্তর কোরিয়ার সরকারী প্রচারাভিযানের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছিল, যেখানে নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল।
প্রকৃতপক্ষে, বহু শরণার্থী জানান যে তারা ফসলের ক্ষেত ও কারখানায় বাধ্যতামূলক শ্রমে জড়িয়ে পড়েছিলেন, চলাচল সীমাবদ্ধ ছিল এবং দেশের বাইরে যাওয়ার কোনো অনুমতি পেতেন না। এই শর্তগুলো তাদের দৈনন্দিন জীবনে গভীর মানসিক ও শারীরিক ক্ষতি সৃষ্টি করেছিল।
একজন শিকায়ী, ইকো কাঝাওয়াকি, ১৯৬০ সালে মাত্র সতেরো বছর বয়সে উত্তর কোরিয়ায় গিয়েছিলেন এবং ২০০৩ সালে পালিয়ে আসেন; বর্তমানে তিনি ৮৩ বছর বয়সী। তার দীর্ঘ সময়ের অভিজ্ঞতা এই রকম প্রলুব্ধকরণে জড়িত বহু মানুষের কষ্টের প্রতিফলন।
আইনি লড়াইটি ২০২২ সালে টোকিও জেলা আদালতে প্রথমে প্রত্যাখ্যান করা হয়, যেখানে আদালত বলেছিল যে বিষয়টি জাপানি বিচারব্যবস্থার অধীনে নয় এবং সময়সীমা শেষ হয়ে গিয়েছিল। তবে ২০২৩ সালে টোকিও উচ্চ আদালত এই সিদ্ধান্ত উল্টে বিষয়টি জাপানি অধিক্ষেত্রের আওতায় রাখে এবং উত্তর কোরিয়ার মানবাধিকার লঙ্ঘন স্বীকার করে।
টোকিও জেলা আদালতের বিচারক তাইচি কামিনো রায়ে উল্লেখ করেন যে শিকায়ীদের অধিকাংশের জীবন উত্তর কোরিয়ার কারণে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। এই মন্তব্য রায়ের গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের স্বীকৃতি পেতে সাহায্য করেছে।
শিকায়ীদের আইনজীবী এটসুশি শিরাকি রায়কে “ঐতিহাসিক” বলে প্রশংসা করেন, তবে একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন যে আদায়ের বাস্তবায়ন একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে। অন্য আইনজীবী কেনজি ফুকুদা রায়ের গুরুত্ব স্বীকার করে, তবে উত্তর কোরিয়ার সম্পদের অভাব ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বিবেচনা করে বাস্তবিক ক্ষতিপূরণ সংগ্রহে কঠিনতা থাকবে বলে ইঙ্গিত দেন।
এই রায়টি জাপান ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনার নতুন মাত্রা যোগ করেছে, কারণ এটি প্রথমবারের মতো জাপানি আদালত উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে সরাসরি তার দায়িত্ব স্বীকার করেছে। আন্তর্জাতিক আইনি ক্ষেত্রেও এটি একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ, যেখানে একটি দেশ অন্য দেশের মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য আইনি দায়িত্ব আরোপ করতে সক্ষম হয়েছে।
তবে রায়ের কার্যকরী দিক এখনও অনিশ্চিত; উত্তর কোরিয়া কোনো সম্পদ জাপানে হস্তান্তর করতে অস্বীকার করেছে এবং কিম জং উনের সরকারী দপ্তরে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। ভবিষ্যতে জাপান সরকার আন্তর্জাতিক চাপ বাড়িয়ে, যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য মিত্র দেশের সমর্থন নিয়ে এই রায়ের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার চেষ্টা করতে পারে।
সারসংক্ষেপে, টোকিও আদালতের এই সিদ্ধান্ত শরণার্থীদের জন্য একটি ন্যায়বিচার অর্জনের সূচনা হতে পারে, তবে বাস্তবিক ক্ষতিপূরণ সংগ্রহের পথে বহু আইনি ও কূটনৈতিক বাধা রয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজরদারি এবং দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে এই রায়কে কার্যকর করা সম্ভব হতে পারে, যা ভবিষ্যতে অনুরূপ মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের পথ প্রশস্ত করবে।



