ঢাকা শহরে ব্যক্তিগত চাকরিজীবী দিলরুবা আক্তার জানুয়ারি ২২ তারিখে সোনার দাম ঐতিহাসিক শীর্ষে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে এক ভোরি সোনা কেনার সিদ্ধান্ত নেন। দেশীয় সোনার দাম তখন প্রতি ভোরি ২.৫২ লাখ টাকা অতিক্রম করেছিল, যা তার সঞ্চয়ের একটি অংশ ব্যবহার করে তিনি বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্সের এক জুয়েলারি দোকান থেকে গহনা ক্রয় করেন। তিনি ভবিষ্যতে দাম বাড়লে বিক্রি করে মুনাফা অর্জনের পরিকল্পনা করেন এবং দাম হ্রাসের ঝুঁকি কম বলে ধারণা করেন।
দিলরুবা আক্তারের ক্রয়ের পর সোনার দাম দ্রুত নতুন রেকর্ড তৈরি করে, এবং এক সপ্তাহের মধ্যে প্রতি ভোরি ২.৬২ লাখ টাকায় পৌঁছায়। এই ধারাবাহিক উর্ধ্বগতি তার বিনিয়োগের সঠিকতা নিশ্চিত করেছে এবং বাজারে সোনার প্রতি আস্থা বাড়িয়েছে।
সোনার দাম বৃদ্ধির পেছনে দেশের রাজনৈতিক ও আর্থিক পরিবেশের প্রভাব উল্লেখযোগ্য। জাতীয় নির্বাচনের অগ্রিম প্রত্যাশা এবং ব্যাংকিং খাতে চলমান চাপের কারণে অনেক মানুষ সোনাকে নিরাপদ বিনিয়োগের উপায় হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। এই প্রবণতা বিশেষত নগর এলাকায় স্পষ্ট, যেখানে গৃহস্থালির আর্থিক পরিকল্পনা প্রায়শই সোনার মাধ্যমে সুরক্ষিত করা হয়।
বসুন্ধরা সিটিতে অবস্থিত ভেনাস জুয়েলার্সের শাখার একজন কর্মকর্তা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে গ্রাহকদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বেশিরভাগই সোনার দাম আরও বাড়বে বলে বিশ্বাস করে ক্রয় করছেন। এই ক্রয় প্রবণতা স্থানীয় জুয়েলারি বাজারে চাহিদা বাড়িয়ে তুলেছে এবং বিক্রেতাদের জন্য লাভজনক পরিবেশ তৈরি করেছে।
দেশীয় সোনার দাম নির্ধারণে মূল ভূমিকা পালন করে বাংলাদেশ জুয়েলার্স এসোসিয়েশন। এই সংস্থা আন্তর্জাতিক বাজারের শুদ্ধ সোনার মূল্যের পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্থানীয় দাম সমন্বয় করে। সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, শুদ্ধ সোনার দামের উত্থান সরাসরি দেশীয় সোনার দামের বৃদ্ধিতে প্রতিফলিত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে, স্পট সোনার দাম সোমবার ৫,০৮৯.৭৮ ডলার প্রতি আউন্সে পৌঁছায়, যা পূর্বে ৫,১১০.৫০ ডলারের সর্বোচ্চ স্তরকে অতিক্রম করেছে। ২০২৫ সালে সোনার দাম ৬৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ১৯৭৯ সালের পর সর্বোচ্চ বার্ষিক বৃদ্ধি। এই উত্থান মূলত নিরাপদ সম্পদ হিসেবে সোনার চাহিদা, যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রানীতি শিথিলকরণ, এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ক্রমবর্ধমান ক্রয় কার্যক্রমের ফলে হয়েছে।
বিশেষ করে চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডিসেম্বর মাসে চৌদ্দতম ধারাবাহিক মাসে সোনা ক্রয় করেছে, যা গ্লোবাল বাজারে চাহিদা বাড়িয়ে তুলেছে। একই সঙ্গে এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড ফান্ডে রেকর্ড পরিমাণে প্রবাহিত হয়েছে, যা সোনার মূল্যের উত্থানে অতিরিক্ত সহায়তা প্রদান করেছে।
বাংলাদেশ জুয়েলার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি এবং ডায়মন্ড অ্যান্ড ডিভাসের মালিক এনামুল হক খান উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের সোনার বাজার বহু বছর ধরে স্থিতিশীল ও উজ্জ্বল অবস্থায় রয়েছে। তিনি বলেন, দেশীয় চাহিদা এবং আন্তর্জাতিক মূল্যের সমন্বয় বাজারকে সক্রিয় রাখছে এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য আকর্ষণীয় সুযোগ তৈরি করছে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করেন, যদিও বর্তমান সময়ে সোনার দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে, তবে ভবিষ্যতে মুদ্রা নীতি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং স্থানীয় আর্থিক ঝুঁকি দামকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদী দৃষ্টিকোণ থেকে পোর্টফোলিও বৈচিত্র্য বজায় রাখা এবং বাজারের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
সারসংক্ষেপে, সোনার দাম রেকর্ড ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে ঢাকার নাগরিকদের মধ্যে সোনা কেনা ও বিক্রির কার্যকলাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ জুয়েলার্স এসোসিয়েশনের মূল্য নির্ধারণ, আন্তর্জাতিক সোনার মূল্যের উত্থান এবং দেশীয় অর্থনৈতিক পরিবেশের সমন্বয় এই প্রবণতাকে ত্বরান্বিত করেছে। ভবিষ্যতে দাম কীভাবে পরিবর্তিত হবে তা নির্ভর করবে গ্লোবাল মুদ্রা নীতি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্রয় এবং স্থানীয় আর্থিক স্থিতিশীলতার উপর।



