বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে কাজ করবে। “ইন এইড টু দ্য সিভিল পাওয়ার” বিধানের অধীনে তারা ভোটের চার দিন আগে থেকে কার্যক্রম শুরু করবে। এ পদক্ষেপের লক্ষ্য নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করা।
সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ দেশের মোট ৪৯৫টি উপজেলায় ৪৮৯টিতে উপস্থিত থাকবে। বাকি ছয়টি উপজেলা—স›দ্বীপ, হাতিয়া, কুতুবদিয়া, দাকোপ, মনপুরা ও রাঙ্গাবালি—এতে কোনো মোতায়েন হবে না। এই মোতায়েনের আগে দেশের বিভিন্ন স্থানে ইতিমধ্যে ১,১৫১টি প্লাটুন মোতায়েন করা হয়েছে, যা নির্বাচনী সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সহায়তা করবে।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক অশান্তির সময় আহত শতাধিক ছাত্র-জনতাকে সহায়তা ও পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি পূরণ করার পর এখন নির্বাচনী নিরাপত্তা ক্ষেত্রে তার সক্ষমতা প্রমাণের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। ঐ সময়ে তারা দ্রুত ত্রাণ কাজ এবং পুনর্বাসন কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেছিল, যা তাদের বহুমুখী ভূমিকা তুলে ধরেছে।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-এর ঐতিহাসিক পটভূমি ১৭৯৫ সালের ২৯ জুন রামগড় লোকাল ব্যাটালিয়ন হিসেবে শুরু হয়। ব্রিটিশ শাসনের সময় এটি বেঙ্গল মিলিটারি পুলিশ, পরে ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপি আর) এবং শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ রিজার্ভ ফোর্স (বিডিআর) হয়ে পরিবর্তিত হয়। ২০০৯ সালে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ নামে পুনর্গঠন করা হয় এবং তখন থেকে দেশের সীমান্ত রক্ষা, চোরাচালান রোধ, এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা তার মূল দায়িত্ব।
সীমান্ত রক্ষার পাশাপাশি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ দেশের আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ত্রাণ কাজ করতে এবং মাদক পাচার বিরোধে সক্রিয় ভূমিকা রাখে। নারী ও শিশুর সুরক্ষায়ও তারা বিশেষ মনোযোগ দেয়। এই বহুমুখী দায়িত্বের ফলে তারা “সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী” হিসেবে পরিচিত।
মুক্তিযুদ্ধের সময় ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের সদস্যরা সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। এ সময় ১৪১জন সদস্যকে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য বিভিন্ন গৌরবের খেতাব প্রদান করা হয়। দুইজন ল্যান্স নায়েক—নূর মোহাম্মদ শেখ ও মুন্সি আব্দুর রউফ—বীরশ্রেষ্ঠের খেতাব পান। এছাড়া আটজন বীরউত্তম, ৩২জন বীরবিক্রম এবং ৭৭জন বীরপ্রতীক খেতাব অর্জন করেন।
নির্বাচনের আগে বিরোধী দলগুলো বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-এর বৃহৎ মোতায়েন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা নিরাপত্তা বাহিনীর অতিরিক্ত উপস্থিতি ভোটারদের স্বাধীনতা ও গোপনীয়তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে সতর্ক করেছে। তবে সরকার এই উদ্বেগকে স্বীকার করে বলেছে যে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ভোটারদের অধিকার রক্ষা দুটোই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ নির্বাচনী সময়ে মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে কাজ করবে, যার মানে তারা দ্রুত প্রতিক্রিয়া দিতে পারবে এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগে সহায়তা করবে। এই ব্যবস্থা নির্বাচনকেন্দ্র, ভোটার তালিকা কেন্দ্র এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিরাপত্তা বজায় রাখতে সহায়তা করবে।
প্রতিটি উপজেলায় মোতায়েনের পরিকল্পনা স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে করা হয়েছে। নির্বাচনী কর্মকর্তারা বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-এর উপস্থিতি ভোটারদের নিরাপদে ভোটদান নিশ্চিত করতে এবং কোনো অশান্তি বা হিংসা রোধে সহায়তা করবে বলে আশাবাদী।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-এর ঐতিহাসিক গৌরব এবং সাম্প্রতিক ত্রাণ কাজের অভিজ্ঞতা তাকে নির্বাচনী নিরাপত্তা ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার করে তুলেছে। তাদের দীর্ঘকালীন সেবা এবং প্রশিক্ষণ এই দায়িত্বে সফলতা আনতে সহায়তা করবে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন।
নির্বাচনের ফলাফল যদি শান্তিপূর্ণভাবে নির্ধারিত হয়, তবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-এর এই মোতায়েনকে একটি সফল মডেল হিসেবে বিবেচনা করা হবে। অন্যদিকে, যদি কোনো অশান্তি বা বিরোধ দেখা দেয়, তবে তা নিরাপত্তা ব্যবস্থার পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করবে।
সারসংক্ষেপে, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ ৮ থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশের অধিকাংশ উপজেলায় মোতায়েনের মাধ্যমে নির্বাচনকে নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ এবং স্বচ্ছ রাখার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে সরকার নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিচালনা নিশ্চিত করতে চায়, একই সঙ্গে বিরোধী দলের উদ্বেগের প্রতি মনোযোগ দিয়ে নিরাপত্তা ও নাগরিক স্বাধীনতার সমন্বয় বজায় রাখার চেষ্টা করবে।



