ইন্দোনেশিয়া জাকার্তা গত শুক্রবার ফ্রান্সের তৈরি রাফাল যুদ্ধবিমানের প্রথম ত্রয়ী গ্রহণ করেছে। রিকো রিকার্দো সিরাইত, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র, জানিয়েছেন যে বিমানগুলো রোয়েসমিন নুরজাদিন বিমান ঘাঁটিতে অবস্থিত পেকানবরু, সুমাত্রা দ্বীপে স্থাপন করা হয়েছে এবং ইন্দোনেশীয় বিমানবাহিনী ব্যবহারিক প্রস্তুতিতে রয়েছে। এই হস্তান্তর ২০২২ সালে স্বাক্ষরিত আট বিলিয়ন ডলারের রক্ষা চুক্তির অংশ, যা ফরাসি ফ্রিগেট ও সাবমেরিন ক্রয়ের পরিকল্পনাও অন্তর্ভুক্ত করে। ইন্দোনেশিয়া মোট ৪২টি রাফাল জেটের অর্ডার দিয়েছে, যার প্রথম ডেলিভারি এখন সম্পন্ন হয়েছে।
ফ্রান্সের সঙ্গে এই চুক্তি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা পরিবেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়। ইন্দোনেশিয়া দীর্ঘদিনের প্রধান ফরাসি অস্ত্র ক্রেতা এবং বর্তমান প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোর নেতৃত্বে দেশটি প্রতিরক্ষা বাজেটের আধুনিকীকরণে জোর দিচ্ছে, বিশেষ করে পুরনো সরঞ্জামকে নতুন প্রযুক্তি দিয়ে প্রতিস্থাপন করার লক্ষ্যে। রাফাল জেটের গ্রহণের ফলে ইন্দোনেশিয়ার বায়ু প্রতিরক্ষা ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে, যা আঞ্চলিক সামুদ্রিক বিরোধ, সাইবার হুমকি এবং উচ্চ-উচ্চতা থেকে হুমকির মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরের সামরিক সমতা পরিবর্তনের সঙ্গে এই ক্রয়কে যুক্ত করা যায়। একই সময়ে চীন তার এয়ার ফোর্সে শেনঝু ও জি-২০ সিরিজের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করছে, আর ভারতও রাফেল-এন্ড-সোয়ানার মতো প্রকল্পে অগ্রসর। বিশ্লেষকরা ইন্দোনেশিয়ার এই পদক্ষেপকে আঞ্চলিক শক্তি ভারসাম্য রক্ষার জন্য কূটনৈতিক কৌশল হিসেবে উল্লেখ করছেন, কারণ ইন্দোনেশিয়া ASEAN-এর সর্ববৃহৎ সদস্য দেশ এবং তার সামরিক ক্রয় পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা গতিবিধিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
একজন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক মন্তব্য করেছেন, “ইন্দোনেশিয়া রাফাল গ্রহণের মাধ্যমে তার বায়ু শক্তি আধুনিকীকরণে একটি বড় পদক্ষেপ নিয়েছে, যা দক্ষিণ চীন সাগরের নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।” তিনি আরও যোগ করেন যে ফরাসি সরবরাহকারী দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা ইন্দোনেশিয়ার বহুমুখী কূটনৈতিক নীতি শক্তিশালী করে। অন্যদিকে, একটি কূটনৈতিক সূত্র উল্লেখ করেছে, “ইন্দোনেশিয়ার রাফাল ডেলিভারি ফ্রান্সের এশিয়ায় কৌশলগত উপস্থিতি বাড়াবে এবং দুই দেশের রক্ষা শিল্পের পারস্পরিক নির্ভরতা গভীর করবে।”
ফ্রান্সের জন্যও ইন্দোনেশিয়ার অর্ডার কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে। প্যারিসের রক্ষা শিল্পের রপ্তানি ২০২৩ সালে ৪.৫ বিলিয়ন ইউরো অতিক্রম করেছে, এবং ইন্দোনেশিয়া তার প্রধান বাজারগুলোর একটি। রাফাল ডেলিভারির পাশাপাশি ফ্রান্সের ফ্রিগেট ও সাবমেরিন ক্রয়ের পরিকল্পনা দু’দেশের সামরিক সহযোগিতা আরও গভীর করবে, যা প্রশান্ত মহাসাগরে ফরাসি উপস্থিতি বাড়াবে এবং EU‑ASEAN কৌশলগত অংশীদারিত্বকে শক্তিশালী করবে।
সরকারি সূত্র অনুযায়ী রাফাল জেটের পরবর্তী ডেলিভারি ২০২৪ সালের প্রথমার্ধে শুরু হবে, এবং সম্পূর্ণ অর্ডার শেষ হওয়ার পর প্রশিক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা সুমাত্রা ও জাভা দ্বীপে স্থাপন করা হবে। ইন্দোনেশিয়ার বিমানবাহিনী ফ্রান্সে পাইলট প্রশিক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ কর্মশালায় অংশ নেবে, যা নতুন প্ল্যাটফর্মের অপারেশনাল দক্ষতা দ্রুত বাড়াবে। এছাড়া, রাফালকে বিদ্যমান ফ‑১৬ ও সুকোয়াই‑৩৯ ফ্লিটের সঙ্গে সমন্বয় করে বহুমাত্রিক অপারেশনাল সক্ষমতা গড়ে তুলবে।
রাফাল গ্রহণের মাধ্যমে ইন্দোনেশিয়া তার আঞ্চলিক নিরাপত্তা কৌশলে নতুন মাত্রা যোগ করেছে, যা দেশীয় শিল্পের উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্কের সমন্বয়ে গঠিত। ভবিষ্যতে এই আধুনিক যুদ্ধবিমানের ব্যবহার কীভাবে আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোকে প্রভাবিত করবে, তা নজরে থাকবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের, বিশেষ করে আসন্ন ASEAN নিরাপত্তা সম্মেলন ও যৌথ সামরিক অনুশীলনে রাফালের ভূমিকা কী হবে তা নিয়ে।



