মস্তিষ্কের ছোট অংশ সেরেবেলামেও ভাষা প্রক্রিয়ার জন্য বিশেষ একটি অঞ্চল সক্রিয় থাকে, এ বিষয়টি নতুন গবেষণায় প্রকাশিত হয়েছে। এই ফলাফল জানুয়ারি ২২, ২০২৬ তারিখে নিউরন জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় উপস্থাপিত, যেখানে ৮৪৬ জনের মস্তিষ্ক স্ক্যান বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণাটি এমআইটি, হার্ভার্ড এবং ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতালের বিজ্ঞানীরা পরিচালনা করেছেন, এবং ভাষা ব্যাধি রোগীদের জন্য সম্ভাব্য নতুন দিক নির্দেশ করে।
সেরেবেলাম মস্তিষ্কের তলায় অবস্থিত, আকারে গড়ে এক মুঠো এবং মূলত চলন, ভঙ্গি ও সমন্বয় নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। এ পর্যন্ত এর ভূমিকা ভাষা ও চিন্তায় সীমিতভাবে যুক্ত বলে ধারণা করা হতো, তবে সাম্প্রতিক গবেষণা এটিকে বিস্তৃত করে দেখাচ্ছে।
গবেষক দল প্রায় পনেরো বছরের মস্তিষ্ক স্ক্যান ডেটা সংগ্রহ করে, তা একত্রে বিশ্লেষণ করে সেরেবেলামের কার্যকলাপের মানচিত্র তৈরি করেছে। এই বিশ্লেষণে দেখা যায়, গল্প পড়া বা শোনার সময় সেরেবেলামের ডান পাশে চারটি নির্দিষ্ট স্থানে সক্রিয়তা বৃদ্ধি পায়।
সেই চারটি স্থানের মধ্যে তিনটি অন্যান্য কাজের সময়ও সক্রিয় হয়, যেমন গাণিতিক সমস্যার সমাধান, সঙ্গীত শোনা বা শব্দবিহীন চলচ্চিত্র দেখা। অর্থাৎ এই তিনটি অঞ্চল বিভিন্ন জ্ঞানীয় কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে, যা পূর্বের গবেষণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বাকি একটি অঞ্চল বিশেষভাবে ভাষা সংক্রান্ত কাজের জন্য সক্রিয় থাকে, এবং অ-শব্দভিত্তিক চলচ্চিত্র বা গাণিতিক কাজের সময় কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না। এই বৈশিষ্ট্য তাকে ভাষা-নির্দিষ্ট সেরেবেলাম অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
গবেষকরা উল্লেখ করেন, এই আবিষ্কার সেরেবেলামের ভাষা প্রক্রিয়ায় ভূমিকা নিশ্চিত করে এবং পূর্বের তত্ত্বকে শক্তিশালী করে। এটি সেরেবেলামের কার্যক্রমকে আরও বিস্তৃতভাবে বুঝতে সহায়তা করবে, বিশেষত ভাষা ব্যাধি রোগীদের জন্য নতুন থেরাপি বিকাশে সম্ভাবনা তৈরি করবে।
যদি সেরেবেলামের এই নির্দিষ্ট অংশকে লক্ষ্য করে প্রশিক্ষণ বা নিউরোস্টিমুলেশন করা যায়, তবে ভাষা পুনরুদ্ধার প্রোগ্রামকে সমর্থন করা সম্ভব হতে পারে। এমন পদ্ধতি ভবিষ্যতে স্ট্রোক বা ডিমেনশিয়া রোগীদের ভাষা পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
গবেষক দল এখন এই অঞ্চলটির সংযোগ নেটওয়ার্ক এবং সময়গত গতি আরও বিশদে পরীক্ষা করার পরিকল্পনা করছে। এটি সেরেবেলাম এবং মস্তিষ্কের অন্যান্য ভাষা কেন্দ্রের মধ্যে কীভাবে সমন্বয় ঘটে তা স্পষ্ট করবে।
এই গবেষণার ফলাফল বর্তমানের ভাষা ব্যাধি চিকিৎসায় তৎক্ষণাৎ বড় পরিবর্তন আনবে না, তবে দীর্ঘমেয়াদে নতুন দৃষ্টিকোণ প্রদান করবে। সাধারণ পাঠক ও রোগীর জন্য এই তথ্য আশাব্যঞ্জক, কারণ বিজ্ঞান ধীরে ধীরে মস্তিষ্কের জটিলতা উন্মোচন করছে।
আপনি কি মনে করেন, সেরেবেলামের এই ভাষা-নির্দিষ্ট অঞ্চলকে লক্ষ্য করে ভবিষ্যতে কোন ধরনের থেরাপি বিকাশ করা উচিত? বিজ্ঞানী ও চিকিৎসকরা একসাথে কাজ করে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপান্তরিত করতে পারলে রোগীর জীবনের মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হতে পারে।
অংশগ্রহণকারীদের ফাংশনাল ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স ইমেজিং (fMRI) ব্যবহার করে মস্তিষ্কের রিয়েল-টাইম কার্যকলাপ রেকর্ড করা হয়। প্রতিটি পরীক্ষায় তারা গল্পের টেক্সট পড়ে অথবা অডিও রেকর্ডিং শোনে, পাশাপাশি গাণিতিক সমস্যা সমাধান এবং শব্দবিহীন চলচ্চিত্র দেখার কাজও সম্পন্ন করে।
সেরেবেলামের ভাষা সংক্রান্ত ভূমিকা পূর্বে সীমিত গবেষণায় সূচিত হলেও, এই বৃহৎ স্কেল বিশ্লেষণ প্রথমবারের মতো স্পষ্টভাবে ভাষা-নির্দিষ্ট অঞ্চল চিহ্নিত করেছে। এতে সেরেবেলামকে শুধুমাত্র মোটর নিয়ন্ত্রণের অঙ্গ হিসেবে নয়, জ্ঞানীয় ও ভাষা নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে পুনর্বিবেচনা করা সম্ভব হয়েছে।
ভাষা ব্যাধি রোগীদের জন্য সেরেবেলামের এই অংশকে লক্ষ্য করে নিউরোস্টিমুলেশন বা আচরণগত প্রশিক্ষণ প্রয়োগের সম্ভাবনা গবেষকদের উন্মুক্ত করেছে। তবে বাস্তবিক প্রয়োগের আগে দীর্ঘমেয়াদী ক্লিনিকাল ট্রায়াল এবং নিরাপত্তা মূল্যায়ন প্রয়োজন হবে।



