ইরানের ফুটবলে যুক্ত বিশিষ্ট ব্যক্তিরা ফিফা ও তার ২০০‑এর বেশি জাতীয় সমিতির সভাপতি গণকে সম্বোধন করে একটি প্রকাশ্য চিঠি প্রকাশ করেছেন। চিঠিতে দেশের প্রতিবাদে নিহত ও গ্রেফতার হওয়া ক্রীড়াবিদ, কোচ, রেফারি এবং সাংবাদিকদের প্রতি নিন্দা জানিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলের শীর্ষ কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপের দাবি তোলা হয়েছে।
চিঠির ২০ জন স্বাক্ষরকারীর মধ্যে ১২৩ বার ইরানের জাতীয় দলে খেলেছেন আলি করিমি, পাশাপাশি তিনজন প্রাক্তন পূর্ণ আন্তর্জাতিক, একজন ফুটবল কোচ, একজন রেফারি এবং ক্রীড়া সাংবাদিক অন্তর্ভুক্ত। স্বাক্ষরকারীদের তালিকায় বাখতিয়ার রাহমানি, যিনি পূর্বে বিশ্বকাপের জন্য নির্বাচিত হয়েছিলেন, তাও রয়েছে।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, দেশের ব্যাপক নাগরিক ও জনপ্রিয় আন্দোলনকে ইরানি কর্তৃপক্ষ কঠোর দমন, গণহত্যা এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের উদাহরণ দিয়ে মোকাবিলা করেছে। এই দমনের ফলে এই মাসে প্রতিবাদে নিহতের সংখ্যা ১৮,০০০‑এর বেশি বলে বিভিন্ন সূত্রে জানানো হয়েছে, যদিও কিছু অনুমান আরও বেশি বলে।
ফুটবলের জগতে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে রয়েছে মোজতাবা তর্শিজ, যিনি শীর্ষ বিভাগে খেলেছেন এবং দুইটি ছোট সন্তান রেখে গেছেন। এছাড়া সেবা রশতিয়ান, নারী ফুটবলের সহায়ক রেফারি, এবং যুব কোচ মেহদি লাভাসানি নামের ব্যক্তিরাও প্রাণ হারিয়েছেন।
অতিরিক্তভাবে, ফুটবলার আমিরহোসেইন মোহাম্মদযাদে এবং রিবিন মোরাদি, পাশাপাশি ইরানের জাতীয় বিচ সকার দলের গোলকিপার মোহাম্মদ হাজিপুরের নাম চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এই সব ক্রীড়াবিদদের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তাদের পরিবার ও সমর্থকদের শোকের স্রোত প্রবাহিত হয়েছে।
চিঠিতে ১৯ বছর বয়সী আমিরহাসান গাদারজাদেহের অবস্থার প্রতি বিশেষ উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। তিনি সেপাহান ইসফাহানের খেলোয়াড় এবং প্রতিবাদে অংশগ্রহণের কারণে মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিতে আছেন বলে জানানো হয়েছে। তার পরিবারকে এই হুমকির বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে।
গাদারজাদেহের মামলা সাম্প্রতিককালে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও নিন্দা করেছে, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে। এই বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইরানের মানবাধিকার পরিস্থিতির প্রতি মনোযোগ বাড়িয়ে দিয়েছে।
চিঠিতে ইন্টারনেট ও টেলিফোন পরিষেবার ব্যাপক বন্ধের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে, যা দেশের নাগরিকদের তথ্যপ্রাপ্তি ও যোগাযোগের স্বাধীনতাকে কঠোরভাবে সীমাবদ্ধ করেছে। এই ডিজিটাল বন্ধনকে দমনমূলক কৌশল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ফিফা সভাপতি জিয়ানি ইনফ্যান্টিনোর কাছে চিঠিতে স্পষ্টভাবে আহ্বান জানানো হয়েছে যে, তিনি এই মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট ও দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করুন এবং ইরানের ক্রীড়া সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণ বন্ধ করার জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন গড়ে তুলুন।
স্বাক্ষরকারীরা আরও উল্লেখ করেছেন যে, ফুটবলের মাধ্যমে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার সম্ভাবনা রয়েছে, তাই এই ধরনের দমনমূলক কার্যকলাপ ক্রীড়ার মূল উদ্দেশ্যকে ক্ষুণ্ন করে। তারা ফিফা ও জাতীয় সমিতিগুলোর কাছে অনুরোধ করেন যে, ইরানে ক্রীড়াবিদদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।
চিঠির প্রকাশের পর থেকে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থাগুলোর প্রতিক্রিয়া প্রত্যাশিত, তবে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে ক্রীড়া জগতে এই ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতি সংবেদনশীলতা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ইরানের ফুটবলের এই বিশিষ্ট ব্যক্তিরা যে ন্যায়বিচার ও মানবিক সুরক্ষা চায়, তা আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সম্প্রদায়ের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হতে পারে। ভবিষ্যতে ফিফা কী পদক্ষেপ নেবে তা দেশের ক্রীড়াবিদ ও সাধারণ জনগণের নিরাপত্তা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



