ব্রিটেনের টেলিভিশন এবং বেকিং জগতে পরিচিত নাদিয়া হুসেইন, তার সর্বশেষ রন্ধন বই ‘রোজা’ প্রকাশের মাধ্যমে রমজানের রাতের খাবারকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করেছেন। এই বইটি রমজানের উপবাস ও ইফতারের মুহূর্তগুলোকে পরিবারিক টেবিলের সঙ্গে যুক্ত করে, এবং সিলেটি ও বাংলাদেশী রন্ধনপ্রথার গভীরতা তুলে ধরে।
‘রোজা’ শিরোনামটি রমজানের আরেকটি নাম, যা দক্ষিণ এশীয় মুসলিম গৃহে সাধারণত ব্যবহৃত হয়। হুসেইন এই শব্দটি বেছে নিয়ে তার শৈশবের স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে পুনরুজ্জীবিত করতে চান, যা তিনি তার বংশধরদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
লাটনে জন্ম নেওয়া হুসেইনের পরিবার সিলেট, বাংলাদেশ থেকে আগত। তার শৈশবের রমজান ছিল ঘরের মধুর পরিবেশে, যেখানে সুপারমার্কেটের রমজান আইল বা শপিং মলের প্রচার না থাকলেও খাবার প্রস্তুতিতে মনোযোগ ও উদারতা ছিল প্রধান। এই অভিজ্ঞতা তার নতুন বইতে প্রতিফলিত হয়েছে, যেখানে রমজানকে একটি পুরনো বন্ধুর মতো বর্ণনা করা হয়েছে, যিনি প্রতি বছর ঠিক সময়ে ফিরে আসেন।
বইটি রমজানের দিনগুলোকে উপবাসের সীমাবদ্ধতা এবং সন্ধ্যায় খাবারের আনন্দের সঙ্গে সংযুক্ত করে। হুসেইন উল্লেখ করেন যে, এক দিনের উপবাসের পর সূর্যাস্তে টেবিলে যে খাবার রাখা হয়, তা শুধুমাত্র পুষ্টি নয়, বরং পারিবারিক ভালোবাসা ও ঐতিহ্যের প্রতীক।
‘রোজা’ তে উপস্থাপিত রেসিপিগুলোতে ঐতিহ্যবাহী বাংলাদেশী পদ যেমন হালিম, পান্তা ভাত, মিষ্টি পিঠা এবং সিলেটি মশলাদার খাবার অন্তর্ভুক্ত। একই সঙ্গে আধুনিক রন্ধনশৈলীর ছোঁয়া যুক্ত করে, যাতে রমজানের খাবারগুলো সহজে প্রস্তুত করা যায় এবং তরুণ প্রজন্মের স্বাদেও মানানসই হয়।
বইয়ের কাঠামোটি রমজানের বিভিন্ন দিককে পর্যায়ক্রমে উপস্থাপন করে; প্রথমে উপবাসের প্রস্তুতি, পরে ইফতার এবং সেহরির খাবার, এবং শেষে উৎসবের মিষ্টি। প্রতিটি অংশে হুসেইন তার নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও পরিবারিক রীতিনীতি শেয়ার করেন, যা পাঠকদেরকে রমজানের প্রকৃত সত্তা অনুভব করতে সাহায্য করে।
‘রোজা’ প্রকাশের পর ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি প্রকাশনা সংস্থা ও রন্ধনপ্রেমী সমালোচক বইটির স্বাদে মুগ্ধতা প্রকাশ করেছেন। তারা উল্লেখ করেন যে, হুসেইনের রন্ধনশৈলী এখনো ব্রিটিশ গৃহে জনপ্রিয়, তবে এই বইটি তার বংশধরদের সঙ্গে সংযোগের নতুন সেতু গড়ে তুলেছে।
বইয়ের কভার ডিজাইনেও সিলেটের ঐতিহ্যবাহী নকশা ও রঙের ব্যবহার করা হয়েছে, যা পাঠকের দৃষ্টিতে তৎক্ষণাৎ বাংলাদেশী রমজানের চিত্র তুলে ধরে। হুসেইন এই ডিজাইনকে তার শিকড়ের প্রতি সম্মান জানিয়ে দেখেছেন।
‘রোজা’ তে উল্লেখিত কিছু বিশেষ রেসিপি, যেমন গরম গরম পান্তা ভাতের সঙ্গে মশলাদার ডাল, অথবা সিলেটি মিষ্টি পায়েস, রমজানের ইফতার টেবিলে নতুন স্বাদ যোগ করতে পারে। এই রেসিপিগুলো সহজ উপকরণে তৈরি করা যায় এবং পরিবারের সবাই মিলে রান্না করতে পারে।
হুসেইন রমজানের সময় পরিবারিক একতা ও ভাগাভাগির গুরুত্বকে পুনরায় জোর দিয়ে বলেন যে, খাবার কেবল পেট ভরাতে নয়, বরং আত্মিক সংযোগ গড়ে তুলতে সহায়ক। তার বইতে এই দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে, যা রমজানের মৌলিক সত্তাকে তুলে ধরে।
‘রোজা’ প্রকাশের মাধ্যমে হুসেইন তার পূর্বপুরুষদের রন্ধনপ্রথা ও সংস্কৃতিকে আধুনিক পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে চান। তিনি আশা করেন যে, এই বইটি রমজানের সময় বাংলাদেশী পরিবারগুলোকে তাদের ঐতিহ্যের সঙ্গে পুনরায় সংযুক্ত করবে এবং নতুন প্রজন্মকে এই রন্ধনশৈলীর প্রতি আগ্রহী করবে।
বইটি ইতিমধ্যে অনলাইন ও শারীরিক বইয়ের দোকানে বিক্রয়ের জন্য উপলব্ধ, এবং রমজান মাসের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে পাঠকদের কাছ থেকে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যাচ্ছে। হুসেইনের ‘রোজা’ রমজানের খাবারকে শুধু স্বাদ নয়, বরং স্মৃতি ও পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করে, যা এই পবিত্র মাসকে আরও সমৃদ্ধ করে তুলবে।



