রংপুর মহানগরে ১৮ থেকে ২০ জুলাই পর্যন্ত চলা ছাত্র-জনতা আন্দোলনের সময় পুলিশ ৬১টি গুলির রাউন্ড, ১,৫৩৯টি রাবার বুলেট, ৩৪৯টি টিয়ার শেল এবং ৬৮টি সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে। তৎকালীন রংপুর মহানগর পুলিশ (আরএমপি) উপকমিশনার মো. আবু বকর সিদ্দীক এই ব্যবহারের বৈধতা নিশ্চিত করে একটি অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদন জারি করেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই তিন দিনে পুলিশ চায়না রাইফেল দিয়ে ৫০টি গুলির রাউন্ড এবং এমএম পিস্তল দিয়ে ১১টি রাউন্ড গুলি করে, পাশাপাশি রাবার বুলেট, টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এসব পদক্ষেপকে তিনি “যুক্তিসঙ্গত” বলে উল্লেখ করেন।
গণতান্ত্রিক প্রতিবাদ দমন করতে গিয়ে রংপুরে গুলিবর্ষণ ঘটায় বেশ কয়েকজনের মৃত্যু হয়। ঘটনাটির পর দেশব্যাপী আন্দোলন তীব্রতর হয়, তবে রংপুরে গুলিবর্ষণের বৈধতা নিয়ে রিপোর্ট প্রকাশের ফলে জনমত বিশালভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করে।
আবু বকর সিদ্দীক তখন রংপুর মহানগর পুলিশের (আরএমপি) উপকমিশনার (অতিরিক্ত ডিআইজি পদে পদোন্নতি প্রাপ্ত) ছিলেন। বর্তমানে তিনি ময়মনসিংহ রেঞ্জে অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত ডিআইজি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ায় পুলিশ সংস্থার ভিতরেও অসন্তোষের স্রোত দেখা দেয়।
যদিও রংপুরে গুলিবর্ষণের পর শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের করা হয়, তবু আবু বকর সিদ্দীককে কোনো মামলায় অভিযুক্ত করা হয়নি। একই সময়ে আরএমপি কমিশনারসহ অন্যান্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নামেও অভিযোগ আনা হলেও, সেখানেও তার নাম অন্তর্ভুক্ত হয়নি। অভিযোগ অনুসারে, তিনি “ম্যানেজ” করে নিজেকে অভিযুক্ত তালিকা থেকে বাদ দিয়ে, আবু সাঈদ হত্যার মামলায় সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত হয়েছেন।
গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সময় রংপুরে গুলিবর্ষণ ও গোলাবারুদ ব্যবহারের পর্যালোচনা করার জন্য তৎকালীন আরএমপি কমিশনার ২৫ সেপ্টেম্বর একটি পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেন। কমিটির সভাপতি হিসেবে একই সময়ের উপকমিশনার আবু বকর সিদ্দীক নিযুক্ত হন। তিনি ১৫ অক্টোবর কমিশনারের কাছে একটি প্রতিবেদন জমা দেন, যেখানে গুলিবর্ষণকে “যৌক্তিক” বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন প্রকাশের পর থেকে তদন্ত প্রক্রিয়া ধীরগতিতে এগোচ্ছে। এক বছর অর্ধেকেরও বেশি সময় পার হওয়া সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দাবি করছেন যে তদন্ত এখনও চলমান। তবে তদন্তের ফলাফল ও পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো তথ্য এখনো প্রকাশিত হয়নি।
আবু বকর সিদ্দীককে নিয়ে অভিযোগের মধ্যে একটি হল, তিনি আবু সাঈদের ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পরিবর্তনের চেষ্টা করেছেন। এই অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য কোনো স্বতন্ত্র তদন্তের ফলাফল এখনো প্রকাশিত হয়নি।
রংপুরে গুলিবর্ষণের পরিপ্রেক্ষিতে, দেশের অন্যান্য অংশেও একই ধরনের পুলিশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠে। তবে রংপুরের ঘটনায় ব্যবহৃত গোলাবারুদের সুনির্দিষ্ট পরিমাণ ও ধরণ, এবং তা যুক্তিসঙ্গত বলে ঘোষিত হওয়া, দেশের নিরাপত্তা সংস্থার কার্যপ্রণালীর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রশ্ন তুলেছে।
বর্তমানে রংপুরের গুলিবর্ষণ সংক্রান্ত তদন্তের দায়িত্বে থাকা কমিটি ও সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা দাবি করছেন যে প্রক্রিয়া চলমান, তবে জনসাধারণের মধ্যে এই বিষয়ের প্রতি অব্যাহত আগ্রহ ও চাপ রয়েছে। ভবিষ্যতে তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল কী হবে, তা দেশের আইনগত ও মানবাধিকার পরিবেশে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।
এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে, রংপুরের গুলিবর্ষণ ও তার পরবর্তী তদন্তের অবস্থা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারি ও আইনি সূত্র থেকে আপডেট পাওয়া যাবে।



