২৬ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ চাংখাঁরপুল হত্যাকাণ্ডের রায় শোনায়, যেখানে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের এবং অধস্তন কনস্টেবলদের ওপর কঠোর শাস্তি আরোপ করা হয়েছে। রায়ে কমান্ড রেসপনসিবিলিটি ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দায়িত্বের আইনি সীমা স্পষ্ট করা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে অনুরূপ মামলায় রেফারেন্স হবে।
আদালত উল্লেখ করে যে, অধস্তন পুলিশ সদস্যরা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশে এবং উত্তাল পরিস্থিতির প্রভাবে গুলি চালাতে বাধ্য হয়েছিলেন, ফলে তাদের কাজকে স্বতঃসিদ্ধ অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এই ভিত্তিতে শীর্ষ তিন কর্মকর্তা—প্রাক্তন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার হাবিবুর রহমান, প্রাক্তন যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী এবং এডিসি আখতারুল—কে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
শীর্ষ কর্মকর্তাদের মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি, আদালত তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দেয়, যাতে শাস্তির কার্যকরতা নিশ্চিত হয়। এই সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের প্রক্রিয়া আইনগতভাবে সম্পন্ন হবে এবং সংশ্লিষ্ট সম্পদ সরকারী তহবিলে যুক্ত হবে।
শীর্ষ কর্মকর্তাদের পরেও, প্রাক্তন সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) মো. ইমরুলকে ছয় বছরের কারাদণ্ড এবং শাহবাগে থানার ইন্সপেক্টর মো. আরশাদ হোসেনকে চার বছরের কারাদণ্ড আরোপ করা হয়েছে। উভয়ই গুলিবর্ষণের সময় সরাসরি অংশগ্রহণের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন।
অধস্তন স্তরে, কনস্টেবল সুজন হোসেন, ইমাজ হোসেন এবং নাসিরুল ইসলাম প্রত্যেককে তিন বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তাদের দোষের মূল কারণ ছিল ঊর্ধ্বতনদের আদেশে গুলি চালানোর বাধ্যবাধকতা, যা আদালত লঘুকারী পরিস্থিতি হিসেবে বিবেচনা করেছে।
কনস্টেবলদের লঘু দণ্ডের পেছনে আদালত উল্লেখ করেছে যে, সুজন হোসেন মাত্র কয়েক মাস আগে চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন এবং তিনি আদেশ অমান্য করতে পারতেন না। একইভাবে, ইমাজ হোসেন ও নাসিরুল ইসলামও ঊর্ধ্বতনদের আদেশে গুলি চালাতে বাধ্য হয়েছিলেন, যা আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনে লঘুকারী পরিস্থিতি হিসেবে স্বীকৃত।
৫ আগস্টের উত্তাল পরিস্থিতিতে, এডিসি আখতারুল গুলির নির্দেশ দেন এবং অস্ত্র সরবরাহ করেন। আদালত রায়ে উল্লেখ করে যে, ঊর্ধ্বতনের মুখের ওপর না বলা কনস্টেবলদের জন্য এটি লঘুকারী পরিস্থিতি, কারণ তারা সরাসরি হুমকির মুখে ছিলেন। আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে এই ধরনের চাপকে শাস্তির মাত্রা কমাতে বিবেচনা করা হয়।
হাবিবুর রহমানের ক্ষেত্রে, আদালত রায়ে উল্লেখ করে যে তিনি বেতার বার্তার মাধ্যমে সকল ইউনিটকে বিক্ষোভকারীদের ওপর সর্বোচ্চ শক্তি ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এই নির্দেশের ফলে গুলিবর্ষণ ঘটায় এবং বহু মানুষ প্রাণ হারায়। এডিসি আখতারুল মাঠে সেই আদেশ বাস্তবায়ন করেন, যা শীর্ষ কর্মকর্তাদের দায়িত্বকে আরও স্পষ্ট করে।
বিচারকরা শীর্ষ কর্মকর্তাদের অপরাধের গুরত্বের ওপর জোর দিয়ে বলেন, তাদের আদেশ সরাসরি প্রাণহানির কারণ হয়েছে এবং তাই মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি ন্যায়সঙ্গত। একই সঙ্গে, কনস্টেবলদের জন্য লঘুকারী পরিস্থিতি বিবেচনা করে তিন বছরের কারাদণ্ড নির্ধারিত হয়েছে।
রায়ে কমান্ড রেসপনসিবিলিটি এবং অধস্তনদের বাধ্যগত আনুগত্যের আইনি সীমারেখা স্পষ্ট করা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে পুলিশ বাহিনীর আদেশ পালন ও দায়িত্ববোধের ওপর প্রভাব ফেলবে। আদালত এই রায়ের মাধ্যমে নির্দেশ দিয়েছে যে, শীর্ষ কর্মকর্তারা যদি অবৈধ আদেশ দেন, তবে তারা সরাসরি শাস্তির আওতায় পড়বেন।
এই রায়ের পর, শাস্তি প্রাপ্তদের আইনি আপিলের অধিকার রয়েছে এবং তারা নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে উচ্চতর আদালতে আপিল করতে পারবেন। আপিল প্রক্রিয়া চলাকালীন সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের কার্যক্রম স্থগিত থাকবে না এবং তা যথাযথভাবে সম্পন্ন হবে।
এই মামলাটি ২০২২ সালের চাংখাঁরপুলে ঘটিত হিংসাত্মক দমনমূলক কার্যক্রমের পরিপ্রেক্ষিতে করা হয়েছে, যেখানে পুলিশ বাহিনীর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ উঠে আসে। সরকার এই রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ প্রোটোকল পুনর্বিবেচনা এবং মানবাধিকার সংরক্ষণে নতুন নীতি প্রণয়নের কথা জানিয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলি রায়কে স্বাগত জানিয়ে বলেছে, তবে তারা আরও ব্যাপক সংস্কার ও প্রশিক্ষণ প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে, যাতে ভবিষ্যতে অনুরূপ ঘটনা রোধ করা যায়। এই রায় বাংলাদেশের আইনি ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শীর্ষ কর্মকর্তাদের মৃত্যুদণ্ডের মাধ্যমে কমান্ড রেসপনসিবিলিটি প্রয়োগের উদাহরণ স্থাপন করেছে।
সামগ্রিকভাবে, রায়টি পুলিশ বাহিনীর আদেশ ও দায়িত্বের মধ্যে স্পষ্ট সীমা নির্ধারণ করে, যা আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে অপরাধের শাস্তি এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে। ভবিষ্যতে এই রায়ের প্রভাব কী হবে তা সময়ই বলবে, তবে বর্তমানে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।



