অন্তর্বর্তী সরকার সোমবার বিকেলে ঢাকার ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে একটি সংবাদ সম্মেলনে সমরাস্ত্র উৎপাদন কারখানা গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সরঞ্জাম চাহিদা পূরণ এবং দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। ঘোষণা অনুযায়ী, কারখানাটি চট্টগ্রাম বিভাগের মিরসরাইয়ে স্থাপিত হবে।
বিবৃতি প্রদান করেন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন। তিনি বলেন, মিরসরাইয়ে “বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি” উদ্যোগের অধীনে সমরাস্ত্র উৎপাদন কারখানা গড়ে তোলা হবে। এই প্রকল্পটি দেশের শিল্প কাঠামোকে শক্তিশালী করে সামরিক সরবরাহ শৃঙ্খলকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার দিকে লক্ষ্য রাখবে।
বিডা মাস্টার প্ল্যানে “ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন” স্থাপনকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলে আশিক চৌধুরী জানান। তিনি উল্লেখ করেন, এই জোনের মাধ্যমে বাংলাদেশকে প্রতিরক্ষা শিল্পে অংশগ্রহণকারী দেশ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। জোনের পরিকল্পনা সম্পন্ন হলে, সংশ্লিষ্ট শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে একত্রে কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
সেই দিনই বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) গভর্নিং বোর্ডের সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার সভাপতিত্ব করেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। সভার পরেই প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম উপস্থিত ছিলেন এবং সম্মেলনে অংশ নেন।
আশিক চৌধুরী সমরাস্ত্র কারখানা স্থাপনের যুক্তি হিসেবে বৈশ্বিক নিরাপত্তা বাস্তবতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সংঘর্ষে দেখা গেছে হাইটেক অস্ত্রের চেয়ে গোলাবারুদ ও মৌলিক সরঞ্জামের ঘাটতি বেশি সমস্যাজনক। তাই দেশীয় উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানো জরুরি, যাতে জরুরি সময়ে স্বয়ংসম্পূর্ণতা নিশ্চিত করা যায়।
প্রকল্পের জন্য নির্ধারিত জমি মূলত ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য বরাদ্দ করা ৮০০ একর ভূমি। তবে ইন্ডিয়ান ইকোনোমিক জোনের পরিকল্পনা বাতিল হওয়ায় এই জমি বর্তমানে ব্যবহারহীন। সরকার এই অব্যবহৃত জমি ব্যবহার করে সমরাস্ত্র কারখানার জন্য ভিত্তি স্থাপন করবে।
বিডা নির্বাহী চেয়ারম্যান স্পষ্ট করে বলেন, বাংলাদেশ “হাইটেক” (অত্যাধুনিক) অস্ত্র তৈরি করবে না। যুদ্ধক্ষেত্র বা অন্যান্য জরুরি পরিস্থিতিতে হাইটেক অস্ত্রের চাহিদা কম, বরং গুলি, ট্যাংকের এক্সেল এবং অন্যান্য মৌলিক যন্ত্রাংশের ঘাটতি বেশি দেখা যায়। তাই কারখানাটি গুলি, ট্যাংক গুলিবার এবং সংশ্লিষ্ট যন্ত্রাংশের উৎপাদনে মনোযোগ দেবে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তাদের চাহিদা অনুযায়ী এই ধরনের সরঞ্জাম উৎপাদনের পরিকল্পনা করেছে। চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর উৎপাদন প্রক্রিয়া ও পরিমাণের বিশদ তথ্য প্রকাশিত হবে বলে আশিক চৌধুরী জানান। এই ধাপটি প্রকল্পের বাস্তবায়নকে আরও স্বচ্ছ করবে।
প্রকল্পের অর্থনৈতিক দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় শিল্পকে জোরদার করে রপ্তানি সম্ভাবনা বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিডা এখন থেকে প্রকল্পের বিশদ পরিকল্পনা প্রস্তুত করবে এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে চুক্তি স্বাক্ষরের পর দ্রুত কাজ শুরু করার লক্ষ্য রাখবে। অনুমান করা হচ্ছে, কারখানাটি চালু হলে দেশের প্রতিরক্ষা শিল্পে স্বয়ংসম্পূর্ণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
আশিক চৌধুরী শেষ মন্তব্যে উল্লেখ করেন, এই উদ্যোগটি শুধুমাত্র রপ্তানি বিষয় নয়, বরং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। তিনি জোর দিয়ে বলেন, স্বয়ংসম্পূর্ণ সমরাস্ত্র উৎপাদন দেশের স্বার্থ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



