চট্টগ্রামের মিরসরাইতে অবস্থিত জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এনএসইজেড)-এ ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন গঠনের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সিদ্ধান্তটি ২৬ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল (বেজা) গভর্নিং বোর্ড সভায় গৃহীত হয়। এই উদ্যোগের নেতৃত্বে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং বেজা নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন ছিলেন।
বেজা গভর্নিং বোর্ডের সভা পরিচালনা করেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। সভায় জোনের সুনির্দিষ্ট সীমানা ও পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা শেষে ৮৫০ একর জমি ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই জমি বর্তমানে খালি এবং পূর্বে ভারতীয় অর্থনৈতিক জোনের অংশ হিসেবে বিবেচিত ছিল, তবে জি-টু-জি কাঠামো থেকে বাদ পড়ার ফলে স্থানটি শূন্য হয়ে গেছে।
চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন উল্লেখ করেন, দেশীয় ও বৈশ্বিক পর্যায়ে সামরিক শিল্পের চাহিদা বাড়ছে এবং বাংলাদেশ এই প্রবণতায় অংশগ্রহণের সুযোগ পেতে পারে। তিনি জানান, বহু বছর ধরে ডিফেন্স প্রোডাকশন নিয়ে আলোচনা চলছিল এবং এখন গ্লোবাল মার্কেটে প্রবেশের সময় সঠিক। এই জোনের মাধ্যমে দেশীয় উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সামরিক সরবরাহের ঘাটতি নিয়ে তিনি বিশেষ দৃষ্টিকোণ তুলে ধরেন। সাম্প্রতিক সংঘর্ষে দেখা গেছে, অস্ত্রের গুলির চেয়ে ট্যাংকের গুলিবিদ্ধি ও ট্যাংক এক্সেলের ঘাটতি বেশি সমস্যার কারণ। তাই ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনে বুলেট ও ট্যাংক এক্সেল উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ে তোলা জরুরি। এই ধরনের ক্যাপটিভ ক্যাপাসিটি গড়ে তোলাই দেশের নিরাপত্তা কৌশলের একটি মূল দিক।
ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বেজা, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সমন্বয় প্রয়োজন। উভয় সংস্থা ও আর্ম ফোর্সেস ডিভিশন একসাথে কাজ করে জোনের প্রযুক্তিগত ও অবকাঠামোগত চাহিদা নির্ধারণ করবে। এ ধরণের সমন্বয় ইতিমধ্যে প্রস্তাবনা পর্যায়ে গৃহীত হয়েছে এবং পরবর্তী ধাপে প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়ন শুরু হবে।
মাস্টার প্ল্যানে ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনকে অন্তর্ভুক্ত করার নীতি নিশ্চিত করা হয়েছে। এই অন্তর্ভুক্তি জোনের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের ভিত্তি গড়ে তুলবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, জোনের অবকাঠামো, লজিস্টিক সাপোর্ট এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা দ্রুত সম্পন্ন হবে।
প্রকল্পের আর্থিক দিক থেকে, সরকার ও বেসরকারি খাতের যৌথ বিনিয়োগের সম্ভাবনা উন্মুক্ত করা হয়েছে। ডিফেন্স সেক্টরে স্থানীয় উৎপাদন বাড়লে রপ্তানি সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে এবং বাণিজ্য ঘাটতি কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়া, জোনের প্রতিষ্ঠা সরাসরি ও পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়তা করবে।
এই উদ্যোগের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য হল বাংলাদেশকে সামরিক শিল্পে স্বনির্ভর দেশ হিসেবে গড়ে তোলা। আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলে নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় প্রযুক্তি ও দক্ষতা বিকাশের মাধ্যমে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন অর্জন করা সম্ভব হবে। জোনের কার্যক্রম শুরু হলে, সংশ্লিষ্ট শিল্পে গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠা পরিকল্পনা রয়েছে।
বেজা এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মতে, ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনের অনুমোদন দেশের শিল্প নীতি ও অর্থনৈতিক কৌশলের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। জোনের সাফল্য নির্ভর করবে নীতিগত সমর্থন, বিনিয়োগের পরিবেশ এবং দক্ষ মানবসম্পদ গঠনের ওপর। তাই, সরকার সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা প্রকল্পে ত্বরান্বিত পদক্ষেপ নিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
সামগ্রিকভাবে, মিরসরাইয়ের ৮৫০ একর জমিতে ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনের অনুমোদন দেশের শিল্প কাঠামোতে নতুন মাত্রা যোগ করবে। এটি কেবল সামরিক সরবরাহের ঘাটতি পূরণই নয়, বরং রপ্তানি সম্ভাবনা, কর্মসংস্থান এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতির দিকেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। ভবিষ্যতে জোনের কার্যক্রম শুরু হলে, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী হবে।



