পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারি ২৬ জানুয়ারি সোমবার থেকে ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) চার দিনের সরকারি সফর শুরু করবেন। এই সফরের মূল উদ্দেশ্য দু’দেশের উচ্চপর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করা। সফরের সময় জারদারি এবং ইউএই প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান একাধিক বিষয়ের ওপর আলোচনা করবেন, যার মধ্যে বাণিজ্য, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, নিরাপত্তা এবং মানুষ‑মানুষের সম্পর্ক অন্তর্ভুক্ত।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় এই সফরের সূচি ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে একটি বিবৃতি প্রকাশ করে জানায় যে, প্রেসিডেন্টের সঙ্গে একটি উচ্চস্তরের প্রতিনিধি দল যুক্ত হবে। দলটিতে অর্থনীতি, পরিকাঠামো ও নিরাপত্তা ক্ষেত্রের প্রধান কর্মকর্তারা অন্তর্ভুক্ত, যারা আলোচনার সময় বিশেষজ্ঞ মতামত প্রদান করবেন।
সফরের সময় জারদারি এবং ইউএই শীর্ষ কর্মকর্তারা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বর্তমান অবস্থা, বাণিজ্যিক লেনদেনের পরিমাণ এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে বিশদ আলোচনা করবেন। বিশেষ করে বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব, বিনিয়োগের সুযোগ এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত সমন্বয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এছাড়া, উভয় দেশের জনগণের মধ্যে সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংযোগকে শক্তিশালী করার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগের ওপরও মতবিনিময় হবে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান গত মাসে পাকিস্তানে প্রথম সরকারি সফর সম্পন্ন করেন। তার সফরে দু’দেশের শীর্ষ কর্মকর্তারা একাধিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন এবং পারস্পরিক সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচনের প্রতিশ্রুতি দেন। জারদারির এই সফর সেই প্রতিদানমূলক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা দু’দেশের কূটনৈতিক বন্ধনকে আরও দৃঢ় করবে।
পাকিস্তান ও ইউএইয়ের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক দীর্ঘদিনের এবং ক্রমবর্ধমান। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের পরে ইউএই পাকিস্তানের তৃতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে অবস্থান করে। বিশেষ করে তেল, গ্যাস, রিয়েল এস্টেট এবং অবকাঠামো প্রকল্পে ইউএই থেকে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ দেখা যায়।
ইউএই, পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সংকটের সময়ে, বিশেষভাবে আবুধাবি থেকে আর্থিক সহায়তা ও ঋণ প্রদান করে দেশের মন্দা মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এই সহায়তা দু’দেশের পারস্পরিক বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করেছে এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ভিত্তি গড়ে তুলেছে।
গত বছর জানুয়ারিতে দু’দেশের মধ্যে রেলওয়ে, অর্থনীতি ও অবকাঠামো খাতে ৩শো কোটি ডলারেরও বেশি মূল্যের সহযোগিতামূলক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তিগুলোতে রেল লাইন সম্প্রসারণ, শিল্প পার্ক নির্মাণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা পাকিস্তানের উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পাকিস্তান এবং ইউএই বহু শত কোটি ডলারের চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে, যা উভয় দেশের বাণিজ্যিক পরিসরকে আরও বিস্তৃত করেছে। এই চুক্তিগুলোতে বিশেষ করে গ্যাস শেয়ারিং, পোর্ট উন্নয়ন এবং কৃষি পণ্য রপ্তানির সুবিধা প্রদান করা হয়েছে।
উল্লেখযোগ্য যে, ইউএই পাকিস্তানের জন্য বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান উৎস। আবুধাবি ভিত্তিক বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো রিয়েল এস্টেট, টেলিকম এবং ফার্মাসিউটিক্যাল সেক্টরে উল্লেখযোগ্য প্রকল্প চালু করেছে, যা দেশের কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তি স্থানান্তরে সহায়তা করছে।
জারদারির সফরের মাধ্যমে উভয় দেশ কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্তরে নতুন সমঝোতা গড়ে তোলার আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে বাণিজ্যিক শুল্ক হ্রাস, বিনিয়োগের শর্তসাপেক্ষে সহজীকরণ এবং নিরাপত্তা সহযোগিতার ক্ষেত্রে নতুন কাঠামো তৈরি হতে পারে। এই ধরণের পদক্ষেপগুলো দু’দেশের কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সফরের শেষ দিনগুলোতে জারদারি এবং আল নাহিয়ান উভয়ই পারস্পরিক স্বার্থে ভিত্তিক আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করবেন, যার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবণতা অন্তর্ভুক্ত। এই আলোচনার ফলাফল ভবিষ্যতে দু’দেশের বহুপাক্ষিক সংলাপকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
সারসংক্ষেপে, প্রেসিডেন্ট জারদারির ইউএই সফর দু’দেশের দীর্ঘস্থায়ী বন্ধনকে নতুন মাত্রা দেবে, বাণিজ্যিক ও বিনিয়োগের সুযোগ বাড়াবে এবং নিরাপত্তা ক্ষেত্রে সমন্বয়কে দৃঢ় করবে। এই সফরকে দু’দেশের কূটনৈতিক ক্যালেন্ডারে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে, যা ভবিষ্যৎ সহযোগিতার পথ সুগম করবে।



