বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি ২০২৬ সালের অমর একুশে বইমেলা রমজান মাসের পরিবর্তে ঈদ‑উল‑ফিতরের পর আয়োজনের প্রস্তাব দিয়েছে। সমিতি গত শনিবার (২৪ জানুয়ারি) সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার কাছে একটি চিঠি পাঠায়, যেখানে বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশ ও ধর্মীয় পরিস্থিতি বিবেচনা করে মেলাটির তারিখ পুনর্নির্ধারণের অনুরোধ করা হয়েছে।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ডিসেম্বর মাসে প্রাথমিকভাবে নির্ধারিত মেলাটির তারিখ কিছু মহলের বিরোধের মুখে পরিবর্তন করা হয়, তবে প্রকাশকদের সঙ্গে কোনো আলোচনা না করে তা স্থগিত করা হয়। পরে ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে মেলাটির নতুন তারিখ ঘোষণা করা হলেও, প্রকাশকরা এটিকে অপ্রতুল বলে বিবেচনা করে। তাদের মতে, ঐ সময়ে জাতীয় নির্বাচন, নির্বাচন‑পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং রমজান একসাথে সংঘটিত হবে, যা লেখক, পাঠক ও প্রকাশকদের ওপর বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি ঘটাতে পারে।
সমিতি উল্লেখ করেছে, গত ছয় বছর ধরে কোভিড‑১৯ মহামারি এবং রাজনৈতিক অশান্তি প্রকাশনা শিল্পকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করেছে। রমজানে রোজা, ইফতার ও ত্রাবিহের ব্যস্ততা পাঠকদের মেলায় উপস্থিতি কমিয়ে দিতে পারে, ফলে বিক্রয় ও ব্যবসায়িক আয় হ্রাস পাবে। এই প্রেক্ষাপটে ১৯ জানুয়ারি ২৬২ জন প্রকাশকের আবেদন এবং ২২ জানুয়ারি সমিতির মতবিনিময় সভায় সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে বইমেলা ঈদ‑উল‑ফিতরের পর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সমিতির সভাপতি মো. রেজাউল করিম বাদশা বলেন, অধিকাংশ পাঠকের অনুপস্থিতিতে শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিকতা রক্ষার জন্য মেলা আয়োজন করা প্রকাশনা খাতের জন্য কোনো উপকারে আসবে না। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে মেলাটির সময়সূচি পরিবর্তন করা উচিত, যাতে শিল্পের স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় থাকে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, রমজান মাসে প্রকাশনা বিক্রয় সাধারণত কম থাকে, কারণ গ্রাহকরা খাবার ও ধর্মীয় কাজের মধ্যে সময় সীমিত রাখে। একই সঙ্গে, নির্বাচনের আগে ও পরে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিজ্ঞাপনদাতা ও স্পন্সরদের অংশগ্রহণ কমিয়ে দেয়, যা মেলার আর্থিক ভিত্তি দুর্বল করে। ঈদ‑উল‑ফিতরের পরের সময়ে পরিবারিক ছুটি, উপহার ক্রয় এবং সাংস্কৃতিক উদযাপন বৃদ্ধি পায়, ফলে বই বিক্রয় ও প্রকাশনা কার্যক্রমে উত্সাহের সম্ভাবনা বেশি।
প্রকাশকরা আশা করছেন, নতুন তারিখে মেলাটি অধিক পাঠকসংখ্যা আকর্ষণ করবে, যা বিক্রয় আয় বৃদ্ধি এবং নতুন লেখকদের প্রকাশের সুযোগ বাড়াবে। তবে, মেলার সফলতা নির্ভর করবে সরকারী অনুমোদন, নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা এবং নির্বাচনের পরের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, বইমেলা দেশের প্রকাশনা বাজারের মোট আয় এবং কর্মসংস্থান সরাসরি প্রভাবিত করে। মেলার দেরি হলে বিক্রয় চক্রে পরিবর্তন ঘটতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে পাঠকের আগ্রহ বাড়লে প্রকাশনা সংস্থার আয় পুনরুদ্ধার সম্ভব। বিশেষ করে, ঈদ‑উল‑ফিতরের পরের সময়ে উপহার হিসেবে বই কেনার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়, যা প্রকাশকদের জন্য অতিরিক্ত রাজস্বের সুযোগ তৈরি করে।
সারসংক্ষেপে, প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি রমজান ও নির্বাচনের সমন্বয়কে ব্যবসায়িক ঝুঁকি হিসেবে দেখছে এবং মেলাটির তারিখ পরিবর্তনের মাধ্যমে এই ঝুঁকি কমাতে চাচ্ছে। মেলার পুনঃনির্ধারণে সফলতা পেলে প্রকাশনা শিল্পের পুনরুজ্জীবন, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ইতিবাচক প্রভাব এবং পাঠকের সংস্কৃতি গ্রহণে উন্নতি আশা করা যায়। তবে, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সরকারী সহযোগিতা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।



