ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি সদস্য রাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের মধ্যে দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) চূড়ান্ত করার সম্ভাবনা এখন স্পষ্ট হয়েছে। ৭৭তম প্রজাতন্ত্র দিবসের উপলক্ষে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেইন তিন দিনের ভ্রমণে দিল্লি এসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে শীর্ষ বৈঠক করেন। এই বৈঠকেই দুই পক্ষের মধ্যে চুক্তির চূড়ান্ত ঘোষণার ভিত্তি স্থাপিত হতে পারে, যা উভয় বাজারের জন্য নতুন সুযোগের দ্বার উন্মুক্ত করবে।
ভন ডার লেইনের সফর প্রজাতন্ত্র দিবসের প্রধান অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণের মাধ্যমে শুরু হয়, যেখানে তিনি ভারতের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান প্রকাশ করেন। বৈঠকের সময় উভয় নেতার মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও সেবা খাতের বিস্তৃত বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। এফটিএ নিয়ে শেষ পর্যায়ের আলোচনায় পৌঁছানোর ফলে ভবিষ্যতে শুল্ক হ্রাস, নিয়মাবলী সমন্বয় এবং বাজার প্রবেশের সহজতর শর্তাবলী নিশ্চিত হতে পারে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই চুক্তিকে তার সর্ববৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করছে। ভন ডার লেইন উল্লেখ করেন, একটি সমৃদ্ধ ও স্থিতিশীল ভারত বৈশ্বিক অর্থনীতির নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি প্রজাতন্ত্র দিবসে উপস্থিত থাকা তার ক্যারিয়ারের অন্যতম গর্বের মুহূর্ত হিসেবে বর্ণনা করেন।
ডাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে তার বক্তব্যে তিনি চুক্তির মাধ্যমে প্রায় দুই বিলিয়ন মানুষের বাজার গড়ে উঠবে, যা বিশ্ব উৎপাদনের প্রায় এক-চতুর্থাংশের সমান। এ ধরনের বাজারের আকার ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর জন্য প্রথম-চলক সুবিধা তৈরি করবে, বিশেষ করে দ্রুত বর্ধনশীল ভারতীয় অর্থনীতির সঙ্গে অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রে।
বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১৩৫ বিলিয়ন ডলার ছিল, যা দুই পক্ষের মধ্যে বিদ্যমান বাণিজ্যিক সম্পর্কের শক্তি নির্দেশ করে। এই পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে এফটিএ বাস্তবায়িত হলে উভয় দিকের রপ্তানি-আমদানি পরিমাণে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি প্রত্যাশিত।
বিশেষত গাড়ি শিল্পে চুক্তির প্রভাব স্পষ্ট। ভারত ইউরোপীয় গাড়ি নির্মাতাদের ওপর আরোপিত শুল্ক কমাতে সম্মত হয়েছে, যার ফলে ভল্কসওয়াগেন, মার্সিডিজ-বেঞ্জ ও বিএমডব্লিউয়ের মতো ব্র্যান্ডের পণ্য ভারতীয় বাজারে সহজে প্রবেশ করতে পারবে। শুল্ক হ্রাসের ফলে এই কোম্পানিগুলোকে দাম কমিয়ে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা অর্জনের সুযোগ মিলবে।
ইউরোপীয় গাড়ি নির্মাতাদের জন্য এটি কেবল বিক্রয় বৃদ্ধিই নয়, স্থানীয় উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ে তোলার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে। ভারতীয় গ্রাহকদের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে উচ্চমানের গাড়ির চাহিদা বাড়বে, যা ইউরোপীয় ব্র্যান্ডের জন্য লাভজনক বাজার হয়ে উঠতে পারে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ভারতের বাণিজ্য আলোচনার শিকড় ২০০৭ সালে, তবে ২০১৩ সালে সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। ২০২২ সালে পুনরায় শুরু হওয়া আলোচনাগুলো ধীরে ধীরে অগ্রসর হয়ে আজকের ঐতিহাসিক মুহূর্তে পৌঁছেছে। এই দীর্ঘায়িত প্রক্রিয়া দুই পক্ষের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক ইচ্ছাশক্তির প্রমাণ।
বাজার বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, এফটিএ কার্যকর হলে ইউরোপীয় পণ্যের জন্য ভারতীয় বাজারের প্রবেশ বাধা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে, ফলে রপ্তানি বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে ভারতীয় সেবা খাত, বিশেষ করে আইটি ও আর্থিক সেবা, ইউরোপীয় গ্রাহকদের কাছে আরও সহজে পৌঁছাতে পারবে। এই দ্বিমুখী সুবিধা উভয় অর্থনীতির বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে।
তবে কিছু ঝুঁকি উপেক্ষা করা যায় না। শুল্ক হ্রাসের ফলে স্থানীয় উৎপাদনকারীদের প্রতিযোগিতা বাড়বে, যা কিছু সেক্টরে মূল্যসংকোচন ও কর্মসংস্থান হ্রাসের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। এছাড়া নিয়মাবলী সমন্বয়ের প্রক্রিয়া জটিল হতে পারে, যা চুক্তির বাস্তবায়নে সময়সীমা বাড়িয়ে দিতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ভারতের মধ্যে এফটিএ চুক্তি উভয় বাজারের জন্য নতুন বৃদ্ধির পথ খুলে দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। শুল্ক হ্রাস, বাজার প্রবেশের সহজতা এবং নিয়মাবলীর সমন্বয়ই মূল চালিকাশক্তি হবে। ভবিষ্যতে এই চুক্তি কীভাবে বাস্তবায়িত হবে এবং তার প্রভাব কতটা গভীর হবে, তা পর্যবেক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
এই চুক্তি যদি সফলভাবে সম্পন্ন হয়, তবে এটি কেবল বাণিজ্যিক পরিসরই বাড়াবে না, বরং ইউরোপ ও ভারতের কৌশলগত অংশীদারিত্বকে নতুন স্তরে নিয়ে যাবে। উভয় পক্ষের অর্থনৈতিক নীতি, বিনিয়োগ প্রবাহ এবং শিল্প কাঠামোর ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবের সম্ভাবনা রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মানচিত্রে নতুন দিকনির্দেশনা সৃষ্টি করবে।



