আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা গত সপ্তাহে রাজ্যের কিছু অংশে মুসলিম অভিবাসীদের উচ্ছেদ পরিকল্পনা নিয়ে বিতর্ক উসকে দিয়েছেন। তিনি বলছেন, রাজ্যের মধ্যে কেবল বাংলা ভাষাভাষী মুসলিমদেরই উচ্ছেদ করা হচ্ছে, অন্য কোনো গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করা হচ্ছে না। এই মন্তব্যগুলো নির্বাচনের আগে রাজনীতির উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলেছে।
শর্মা উল্লেখ করেন, “আসামে শুধু ‘মিয়া’দেরই উচ্ছেদ করা হয়। অসমীয়াদের কীভাবে উচ্ছেদ করা হতে পারে?” তিনি গৌহাটির পার্বত্য অঞ্চলে উচ্ছেদ অভিযান চালানোর গুজবের বিরোধিতা করে বলেন, এই ধরনের তথ্য মিডিয়ার অতিরঞ্জন। “নির্বাচন পর্যন্ত যখন একটি উচ্ছেদও হবে না, তখন পাহাড়ে বসবাসকারীরা বুঝবেন যে মিডিয়াই তাদের অকারণে আতঙ্কিত করেছে,” তিনি যোগ করেন।
‘মিয়া’ শব্দটি আসামে বাংলা ভাষাভাষী মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য ব্যবহৃত একটি অবমাননাকর উপাধি, যা প্রায়শই বাংলাদেশি অভিবাসীকে নির্দেশ করতে ব্যবহৃত হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু সদস্য এই শব্দকে আত্মমর্যাদার প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করতে শুরু করেছে, যদিও এটি এখনও বহুল সমালোচিত। শর্মা এই শব্দটি ব্যবহার করে উল্লেখ করেন যে উচ্ছেদের লক্ষ্য কেবল এই গোষ্ঠী।
গৌহাটির পাহাড়ি এলাকায় উচ্ছেদ হবে—এমন গুজব ছড়াচ্ছে গণমাধ্যমই, শর্মা বলেন, “মিডিয়া অযথা আতঙ্ক সৃষ্টি করছে।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, সরকার পাহাড়ি জনগণের জন্য ভূমি অধিকার নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিচ্ছে, তবে একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন যে কোনো মুসলিম অভিবাসীকে উচ্ছেদের নোটিশ দেওয়া হবে।
আসামের বিধানসভার নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছে; এই বছর প্রথমার্ধে ১২৬ সদস্যের বিধানসভা নির্বাচন নির্ধারিত। শর্মা জানান, বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় ফিরে আসার প্রচেষ্টা চালাবে। তিনি যোগ করেন, “বিজেপি গত দশ বছর ধরে রাজ্যে শাসন করছে,” এবং জোটের পুনরায় শাসন পুনর্গঠন করার লক্ষ্যে কাজ চালিয়ে যাবে।
বিপিএলের শাসনকালে সরকার পার্বত্য অঞ্চলে ভূমি স্বীকৃতি প্রদান প্রকল্প চালু করেছে। শর্মা এই প্রকল্পের অগ্রগতি তুলে ধরে বলেন, “পাহাড়ে বসবাসকারী জনগণকে আইনগতভাবে তাদের জমি প্রদান করা হচ্ছে,” তবে তিনি একই সঙ্গে উল্লেখ করেন, “যেকোনো মুসলিম অভিবাসীকে উচ্ছেদের নোটিশ জারি করা হবে,” যা উভয় নীতি একসাথে চালু করার ইঙ্গিত দেয়।
শর্মা কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ভোট তোষণের অভিযোগও উত্থাপন করেন। তিনি বলেন, কংগ্রেসের দলীয় টিকিটের জন্য মোট ৭৫০টি আবেদন পেয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৬০০টি ‘মিয়া’দের থেকে এসেছে। হিন্দু প্রার্থীর আবেদন সংখ্যা মাত্র ১২০ থেকে ১৩০ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ, যা তিনি ভোটের ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
এই তথ্যের ভিত্তিতে শর্মা কংগ্রেসকে “ধর্ম ও সংস্কৃতির হুমকি” হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং দাবি করেন, “যত দৃঢ়ভাবে আমরা তাদের পরাজিত করতে পারব, তত বেশি আমরা আমাদের রাজ্য ও জাতি রক্ষা করতে পারব।” তিনি কংগ্রেসের সভাপতি গৌরব গগৈয়ের পাকিস্তানের সঙ্গে সম্ভাব্য যোগাযোগের তথ্য শীঘ্রই প্রকাশ করা হবে বলে ইঙ্গিত দেন।
শর্মা আরও যোগ করেন, “আমি ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত এই বিষয়ে সকল তথ্য সংগ্রহ করে জনসাধারণের সামনে উপস্থাপন করব,” যা নির্দেশ করে যে তিনি এই বিষয়টি নির্বাচনের আগে জনমত গঠন করতে চান।
এ পর্যন্ত কংগ্রেসের পক্ষ থেকে কোনো সরাসরি মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, শর্মার এই ধরনের উচ্ছেদ ও ভোট তোষণ অভিযোগ নির্বাচনী সময়ে ভোটারদের মনোভাবকে প্রভাবিত করতে পারে এবং উভয় দলই এই বিষয়গুলোকে রাজনৈতিক লিভারেজ হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।
আসামের পার্বত্য ও নিম্নভূমি অঞ্চলে ধর্মীয় ও ভাষাগত সংবেদনশীলতা দীর্ঘদিনের বিষয়। শর্মার এই মন্তব্যগুলো যদি বাস্তবায়িত হয়, তবে তা স্থানীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে উত্তেজনা বাড়াতে পারে এবং কেন্দ্রীয় সরকারের হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে, বিজেপির পুনরায় শাসন নিশ্চিত করতে হলে এই ধরনের বিতর্ককে রাজনৈতিক সুবিধায় রূপান্তর করা হবে।
ভবিষ্যতে নির্বাচনের ফলাফল এবং শর্মার উল্লিখিত নীতি বাস্তবায়নের মাত্রা নির্ধারণ করবে আসামের সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবেশের দিকনির্দেশনা। উভয় পক্ষের জন্যই এই সময়ে জনমত গঠন, মিডিয়া কভারেজ এবং আইনগত প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।



