ব্রিটিশ সাংবাদিক মার্ক টালি, যিনি দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বিবিসি’র ভারতীয় ভয়েস হিসেবে দক্ষিণ এশিয়ার ঘটনাবলী জানাতেন, সম্প্রতি পরলোক গমন করেছেন। তার মৃত্যু বাংলাদেশে বিশেষভাবে শোকের কারণ, কারণ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তার প্রতিবেদনগুলো দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ড হিসেবে বিবেচিত হয়।
টালি রেডিওতে ক্যারিয়ার শুরু করেন, পরে টেলিভিশনে স্থানান্তরিত হয়ে বিবিসি’র সঙ্গে যুক্ত হন এবং বিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনগুলোকে সরাসরি শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দেন। তার স্বরভঙ্গি এবং বিশ্লেষণাত্মক শৈলী বহু পাঠকের জন্য তথ্যের নির্ভরযোগ্য সূত্র হয়ে ওঠে।
১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তলে (বর্তমান বাংলাদেশ) সশস্ত্র সংঘাতের সময়, টালি ভারতের সীমানা থেকে সরাসরি প্রতিবেদন পাঠিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গৃহযুদ্ধ, গণহত্যা ও নৃশংসতা সম্পর্কে বিশ্বকে জানিয়ে দেন। স্থানীয় মিডিয়া সেনাবাহিনীর দমন নীতি অনুসরণে নীরব থাকায় তার রেডিও ও টেলিভিশন সম্প্রচারই ছিল একমাত্র মুক্ত সূত্র।
এই সম্প্রচারগুলো শরণার্থীদের শিবিরে, সীমান্তে বসবাসকারী মানুষদের এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে অপরাধের বাস্তবতা তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। টালি’র রিপোর্টে উল্লেখিত গণহত্যা, ধর্ষণ ও গ্রাম ধ্বংসের তথ্য পরবর্তীতে জাতিসংঘের আলোচনায় উঠে আসে এবং পাকিস্তানের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়াতে সহায়তা করে।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, টালি’র মতো বহিরাগত মিডিয়ার প্রতিবেদনই ছিল সেই সময়ে আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারকদের জন্য প্রমাণের ভিত্তি, যা শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও অন্যান্য দেশকে রাজনৈতিক ও মানবিক হস্তক্ষেপের দিকে ধাবিত করে।
বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা টালি’র কণ্ঠকে প্রেরণার উৎস হিসেবে গ্রহণ করতেন; তার শব্দে তারা অনুভব করতেন যে তাদের কষ্ট বিশ্বে শোনা যাচ্ছে এবং তা তাদের সংগ্রামের দৃঢ়তা বাড়িয়ে দেয়।
যুদ্ধের পরেও টালি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক পরিবর্তনগুলো অনুসরণ করে আসেন, তবে ১৯৭১ সালের কভারেজই তার ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ শীর্ষবিন্দু হিসেবে রয়ে যায়। তার কাজের মাধ্যমে বিবিসি’র আন্তর্জাতিক সুনামও আরও দৃঢ় হয়।
সম্প্রতি বিবিসি ‘Connected Histories of the BBC’ প্রকল্পের অংশ হিসেবে তার সঙ্গে একটি মৌখিক ইতিহাস সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। এই উদ্যোগের লক্ষ্য হল প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের অভিজ্ঞতা সংরক্ষণ করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ঐতিহাসিক রেকর্ড তৈরি করা।
সাক্ষাৎকারে টালি’কে জিজ্ঞাসা করা হয় যে, মুক্তিযুদ্ধের সময় বিবিসি কি বাংলাদেশের পক্ষে পক্ষপাতিত্ব করেছিল কিনা। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, পাকিস্তানি সরকার তথ্যের প্রবাহ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করছিল, ফলে সংবাদ সংস্থাগুলোকে সীমিত সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করে তা প্রকাশ করতে হতো।
টালি জোর দিয়ে বলেন, সংবাদ সংস্থার মূল দায়িত্ব হল সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও সত্যকে জনসাধারণের কাছে পৌঁছে দেওয়া, এবং যে কোনো পক্ষপাতিত্বের ধারণা মূলত সেই সময়ের ভয়াবহ বাস্তবতার প্রতিফলন। তিনি উল্লেখ করেন, প্রতিবেদনের লক্ষ্য ছিল ঘটনার সত্যিকারের চিত্র তুলে ধরা, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্দোষ পক্ষের সমর্থন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
দূতাবাসীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ১৯৭১ সালের মিডিয়া কভারেজকে প্রায়শই আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের প্রারম্ভিক উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়; পরবর্তী কালের সেরিবিয়া, রুয়ান্ডা ও সিরিয়ার সংঘাতেও বিশ্বব্যাপী সম্প্রচার মাধ্যমের প্রভাব নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মার্ক টালি’র মৃত্যু কেবল একজন অভিজ্ঞ সাংবাদিকের বিদায় নয়, বরং এমন এক কণ্ঠের শেষ যাত্রা যা স্বাধীনতার সংগ্রামকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছিল। তার কাজের মাধ্যমে তথ্যের স্বাধীনতা ও মানবিক ন্যায়বিচারের জন্য সংগ্রাম করা হয়েছে, যা আজও সাংবাদিকতার নৈতিক মানদণ্ডের মূলে রয়েছে।
বাংলাদেশের সংবাদ সংস্থা ও প্রাক্তন মুক্তিযোদ্ধারা টালি’র অবদানের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, স্মরণ করে যে তার কণ্ঠস্বর একসময় সেনাবাহিনীর সেন্সরশিপকে ভেঙে স্বাধীনতার স্বপ্নকে সবার কাছে পৌঁছে দিয়েছিল। তার স্মৃতি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তথ্যের স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচারের পথে অগ্রসর হওয়ার প্রেরণা হিসেবে রয়ে যাবে।



