রাজশাহী বিভাগের পুঠিয়া উপজেলার পোল্লাপুকুর এলাকায় রোববার বিকেল প্রায় পাঁচটায় একটি যাত্রীবাহী অটোরিকশা এবং রাজকীয় পরিবহন নামের একটি বাসের মুখোমুখি ধাক্কা ঘটায়। এই দুর্ঘটনায় এক নারী ও দুই পুরুষসহ মোট তিনজন প্রাণ হারায়। ঘটনাস্থলে উপস্থিত স্থানীয় বাসিন্দা ও শিক্ষার্থীরা তৎক্ষণাৎ সাহায্যের জন্য ছুটে আসে।
দুর্ঘটনা ঘটার মুহূর্তে উভয় গাড়ি বিপরীত দিক থেকে একই সময়ে সড়কে প্রবেশ করায় সংঘর্ষের কারণ হয়। প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, অটোরিকশার চালক গতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হওয়ায় বাসের সঙ্গে ধাক্কা খায়।
দুর্ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গেই স্থানীয় মানুষ আহতদের তৎক্ষণাৎ উদ্ধার করে নিকটস্থ রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। হাসপাতালে পৌঁছানোর পর চিকিৎসকরা দুইজনকে মৃত ঘোষণা করেন, আর একজনকে গুরুতর আঘাতের শিকার হিসেবে ভর্তি করা হয়। মৃতদের মধ্যে একজন নারী এবং দুইজন পুরুষ ছিলেন; তাদের মধ্যে একজন বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।
অটোরিকশার মধ্যে আরও কয়েকজন যাত্রী আঘাত পেয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। আহতদের অবস্থা স্থিতিশীল হলেও চিকিৎসা চলমান রয়েছে।
দুর্ঘটনা ঘটার পর বেলপুকুরিয়া ও পুঠিয়া দুটো থানার কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। তবে দুই থানা নিজেদের অধিক্ষেত্রের পার্থক্য নিয়ে দীর্ঘ সময় বিতর্কে লিপ্ত হয় এবং লাশের হস্তান্তর প্রত্যাখ্যান করে। এই দেরি ও দ্বন্দ্বের ফলে স্থানীয় মানুষদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও শিক্ষার্থীরা দাবি করে যে, ধাক্কা ঘটার পর ঘাতক বাসের চালককে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে এবং কিছু কর্মকর্তার কাছ থেকে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এই অভিযোগের ভিত্তিতে তারা বেলপুকুরিয়া থানার ওসিকে (অফিসার ইন চার্জ) এবং এক উপপরিদর্শককে (এসআই) ঘটনাস্থলে আটকে রাখে।
জনতা ও শিক্ষার্থীরা ওসিকে গাড়ি থেকে নামিয়ে তার ওপর চাপ দেয় এবং তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রাখে। একই সময়ে এসআইকে তাদের হাতে ধরা হয় এবং কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। এই দৃশ্যটি স্থানীয় মিডিয়ায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
বৈরাগ্যজনিত উত্তেজনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পোল্লাপুকুর এলাকায় ঢাকা–রাজশাহী মহাসড়কটি বন্ধ করে প্রতিবাদ শুরু হয়। কয়েক হাজার মানুষ রাস্তায় জড়ো হয়ে চার ঘণ্টার বেশি সময় ধরে অবরোধ বজায় রাখে। সড়কের দুই পাশে গাড়ি-গাড়ি আটকে যায়, ফলে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়।
অবস্থার তীব্রতা বাড়ার পর, পুলিশ বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি)সহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রতিবাদকারীদের সঙ্গে আলোচনা করেন। তারা জনসাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ঘটনার দ্রুত সমাধান চায়।
প্রতিবাদকারীরা সড়কের স্বাভাবিক চলাচল পুনরায় চালু করা এবং অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি করে। তারা দাবি করে যে, দায়িত্বহীনতা ও ঘুষের অভিযোগের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
পুলিশের মুখপাত্র গাজিউর রহমান ইত্তেফাক ডিজিটালকে জানিয়ে বলেন, দুর্ঘটনা ঘটার পর প্রথমে একজনকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং পরে দুইজনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন যে, ঘটনাস্থলে প্রাথমিক তদন্ত চলছে এবং সংশ্লিষ্ট সকলের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অধিক তদন্তের জন্য রেজিস্ট্রেশন নম্বর সহ একটি ফাইল তৈরি করা হয়েছে এবং স্থানীয় তদন্তকারী দলকে ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে। প্রমাণ সংগ্রহ, সাক্ষী বিবৃতি এবং ভিডিও রেকর্ডিংসহ সব তথ্য সংরক্ষণ করা হবে।
দুর্ঘটনার দায়িত্বে থাকা বাসের চালক ও অটোরিকশার চালকের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক অভিযোগ দায়ের করা হবে বলে জানানো হয়েছে। এছাড়া, পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দায়িত্ব লঙ্ঘন ও ঘুষের অভিযোগে শৃঙ্খলাবদ্ধ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিলম্বিত বিচার ও তদন্তের ফলে স্থানীয় জনগণ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং দ্রুত ন্যায়বিচার চায়। আদালতে মামলার শোনার তারিখ নির্ধারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে আইনি প্রক্রিয়ার পূর্ণতা অনুসরণ করতে বলা হয়েছে।



