অন্তর্বর্তী বাংলাদেশ সরকার ১২ জানুয়ারি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) বৈঠকে স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা, আধা-স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা, কর্পোরেশন ও রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানির স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্থায়ন প্রকল্পে ৫০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হলে অনুমোদন প্রক্রিয়া পরিকল্পনা কমিশনে স্থানান্তর করার নির্দেশিকা সংশোধন করেছে। এই পরিবর্তনটি মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর সরাসরি অনুমোদন ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করে, যাতে উচ্চ মূল্যের প্রকল্পগুলো একাধিক স্তরে পর্যালোচনা পায়। লক্ষ্য হল দুর্নীতি রোধ এবং সরকারি সম্পদের ব্যবহারকে অধিক স্বচ্ছ করা।
পূর্বে, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা, আধা-স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা, কর্পোরেশন ও রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানির সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত যেকোনো প্রকল্পের অনুমোদন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর হাতে ছিল, আর্থিক পরিমাণ যাই হোক না কেন। এই প্রথা দীর্ঘদিন ধরে চালু থাকলেও, প্রকল্পের আকারের কোনো সীমা নির্ধারিত না থাকায় স্বচ্ছতা ও দায়িত্ববোধের প্রশ্ন ওঠে।
সংশোধিত নির্দেশিকায় স্পষ্ট করা হয়েছে যে, ৫০ কোটি টাকার বেশি মূল্যের প্রকল্পগুলো পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়ে সেখানে বিশদ যাচাই-বাছাই করতে হবে। কমিশনের অনুমোদন পাওয়ার পর প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপন করা হবে, যেখানে প্রধানমন্ত্রী বা সরকার প্রধানের অনুমোদন চূড়ান্ত হবে। ৫০ কোটি টাকার নিচে ব্যয়ের প্রকল্পের ক্ষেত্রে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা পূর্বের মতোই সরাসরি অনুমোদন দিতে পারবেন।
এই পরিবর্তনটি ২০২২ সালে প্রকাশিত ‘সরকারি খাতে উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন, প্রক্রিয়াকরণ, অনুমোদন ও সংশোধন নির্দেশিকা’ এর ৭ নম্বর অনুচ্ছেদে করা অনুমোদন প্রক্রিয়ার ধারাকে সংশোধন করে। পূর্বের ধারা স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্থায়নে প্রকল্প অনুমোদনের কোনো আর্থিক সীমা নির্ধারণ করত না, যা এখন নতুন সীমা নির্ধারণের মাধ্যমে সমাপ্ত হয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এনইসি সভায় এই বিধান গৃহীত হয়। সভায় উপস্থিত বিশেষজ্ঞরা উচ্চ মূল্যের প্রকল্পে অতিরিক্ত তদারকি প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে, এটি দুর্নীতি প্রতিরোধে সহায়ক হবে বলে মত প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে তারা পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদন প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত সময়সীমা না বাড়িয়ে কার্যকরী ত্বরান্বিত করার গুরুত্বও উল্লেখ করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন নিয়মের মাধ্যমে স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার প্রকল্পে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর একতরফা সিদ্ধান্তের সম্ভাবনা কমে যাবে, ফলে বাজেটের ব্যবহার আরও ন্যায়সঙ্গত হবে। তবে তারা সতর্ক করেন যে, পরিকল্পনা কমিশনের অতিরিক্ত লোডিং এবং একনেকের অনুমোদন প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হলে প্রকল্পের বাস্তবায়নে বিলম্ব ঘটতে পারে। তাই প্রক্রিয়ার সময়সীমা সংক্ষিপ্ত রাখার জন্য প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়াগত সমন্বয় করা জরুরি।
এই পরিবর্তনটি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার আর্থিক স্বায়ত্তশাসনকে সীমিত না করে, বরং উচ্চ মূল্যের প্রকল্পে অতিরিক্ত তদারকি নিশ্চিত করে। ফলে সংস্থাগুলো ছোটখাটো প্রকল্পে দ্রুত কাজ চালিয়ে যেতে পারবে, আর বড় প্রকল্পে পরিকল্পনা কমিশনের পর্যালোচনা নিশ্চিত করবে যে, ব্যয়টি ন্যায়সঙ্গত ও স্বচ্ছ।
অন্তর্বর্তী সরকারের এই পদক্ষেপকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা সরকারী স্বচ্ছতা বাড়ানোর একটি কৌশল হিসেবে দেখছেন। মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর অনুমোদন ক্ষমতা সীমিত করা হলে, সরকারী নীতি ও বাজেটের উপর জনসাধারণের আস্থা বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে, এই পরিবর্তনটি সরকারকে দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনিক সংস্কার চালিয়ে যাওয়ার সংকেত দেয়।
অধিকন্তু, পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদন প্রক্রিয়ার পর একনেকের চূড়ান্ত অনুমোদন প্রয়োজনীয়তা নিশ্চিত করে যে, উচ্চ মূল্যের প্রকল্পগুলো কেবল একক মন্ত্রণালয়ের নয়, সমগ্র সরকারের সমন্বিত দৃষ্টিতে বিবেচিত হবে। এতে প্রকল্পের অর্থনৈতিক প্রভাব, সামাজিক প্রয়োজনীয়তা ও পরিবেশগত দিকগুলোও একসাথে মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।
প্রকল্প অনুমোদনের নতুন কাঠামো কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলোকে তাদের আর্থিক পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করতে হবে। ৫০ কোটি টাকার নিচের প্রকল্পে দ্রুত অনুমোদন পাওয়া যাবে, তবে বড় প্রকল্পের জন্য পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদন পেতে অতিরিক্ত নথিপত্র ও বিশদ বিশ্লেষণ প্রস্তুত করতে হবে।
রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, এই পরিবর্তনটি সরকারকে দুর্নীতি মোকাবেলায় দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়ার ইঙ্গিত দেয় এবং একই সঙ্গে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর ক্ষমতা সীমিত করে শাসনব্যবস্থার ভারসাম্য রক্ষা করে। ভবিষ্যতে এই নীতি কীভাবে বাস্তবায়িত হবে এবং কী ধরণের প্রভাব ফেলবে, তা পর্যবেক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ হবে।
পরবর্তী ধাপে পরিকল্পনা কমিশন ও একনেকের মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে অনুমোদন প্রক্রিয়ার সময়সীমা কমানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। পাশাপাশি, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলোর আর্থিক স্বায়ত্তশাসন বজায় রেখে উচ্চ মূল্যের প্রকল্পে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথাও আলোচনা চলছে।



