বাংলাদেশে গমের উৎপাদন ১০ লাখ টনের উপরে বজায় থাকলেও আবাদ এলাকা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, যা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্য প্রকাশ করে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে গমের মোট আবাদ এলাকা ৪.৪৪ লক্ষ হেক্টর ছিল, আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা ২.৮ লক্ষ হেক্টরে নেমে এসে প্রায় ৩৭ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। একই সময়ে গমের মোট উৎপাদন ১৩.৪৮ লক্ষ টন থেকে ১০.৪১ লক্ষ টনে নেমে প্রায় ২৩ শতাংশ কমে, তবে দশ লক্ষ টনের সীমা অতিক্রম করেছে।
আবাদ এলাকার হ্রাসের পরেও উৎপাদন স্থিতিশীল থাকার মূল কারণ হল গমের গড় ফলন বৃদ্ধি। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে গমের ফলন ৩.০৪ টন প্রতি হেক্টর ছিল, আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা ৩.৭২ টন প্রতি হেক্টরে পৌঁছেছে, যা দশকের মধ্যে ২২ শতাংশেরও বেশি উন্নতি নির্দেশ করে। ফলন বৃদ্ধির পেছনে আধুনিক, তাপ ও রোগ সহনীয় গমের জাতের ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।
গমের আদর্শ তাপমাত্রা ২০ থেকে ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, তবে ৩৫ ডিগ্রি পর্যন্ত সহ্য করতে পারে। বাংলাদেশে শীতকাল স্বল্প হওয়ায় গমের বপন সাধারণত ডিসেম্বরের শুরুর দিকে হয়, আর ফসল কাটার সময় মার্চ ও এপ্রিলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। এই সংকীর্ণ সময়সীমা কৃষকদেরকে গরমের চাপ মোকাবেলায় দ্রুত মাপের এবং তাপ সহনীয় জাত বেছে নিতে বাধ্য করে।
বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা যায়, বিশেষ করে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ‘বাড়ি গম-৩৩’ নামে পরিচিত দ্রুত মাপের এবং তাপ সহনীয় জাতের চাহিদা বাড়ছে। এই জাতের সম্ভাব্য ফলন ৫.৫ টন প্রতি হেক্টর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে এবং ২০১৭ সালে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএআরআই) কর্তৃক বিকাশিত হয়। ২০১৬ সালে ফাঙ্গাল রোগের আক্রমণে গমের ফসল ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর এই জাতের পরিচয় কৃষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা প্রদান করেছে।
বিএআরআই অনুযায়ী, দুই বছর আগে পর্যন্ত ‘বাড়ি গম-৩৩’ গমের আবাদ এলাকার ৩৫ শতাংশ দখল করে ছিল এবং সাম্প্রতিক সময়ে তার বিস্তৃতি আরও বাড়ছে। এই জাতের দ্রুত মাপের বৈশিষ্ট্য এবং তাপ সহনীয়তা কৃষকদেরকে শীতের স্বল্পতা এবং গরমের তীব্রতা মোকাবেলায় সহায়তা করে, ফলে ফলন বৃদ্ধি পায়।
গমের উৎপাদন স্থিতিশীল থাকা দেশের রুটি, পাস্তা এবং অন্যান্য গমজাত পণ্যের সরবরাহে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। আবাদ এলাকার হ্রাস সত্ত্বেও মোট উৎপাদন ১০ লাখ টনের উপরে থাকায় বাজারে গমের দাম তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকে, যা রিটেল দামের ওঠানামা কমিয়ে কৃষকের আয় সুরক্ষিত করে। এছাড়া, গমের স্থিতিশীল সরবরাহ খাদ্য নিরাপত্তা নীতি বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অবশ্যই, দীর্ঘমেয়াদে গমের উৎপাদনকে প্রভাবিত করতে পারে তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রবণতা এবং রোগের বিস্তার। তাই গবেষণা সংস্থাগুলোকে আরও তাপ ও রোগ সহনীয় জাতের উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে, কৃষকদেরকে আধুনিক সেচ প্রযুক্তি এবং সঠিক সেচ ব্যবস্থাপনা গ্রহণে উৎসাহিত করা জরুরি, যাতে শীতের স্বল্পতা ও গরমের চাপের প্রভাব কমানো যায়।
সারসংক্ষেপে, গমের আবাদ এলাকা হ্রাসের পরেও উৎপাদন ১০ লাখ টনের উপরে বজায় রয়েছে, যা ফলন বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে। উন্নত জাতের গ্রহণ এবং গবেষণা সংস্থার সক্রিয় ভূমিকা এই সাফল্যের মূল চালিকাশক্তি। ভবিষ্যতে তাপমাত্রা বৃদ্ধির ঝুঁকি মোকাবেলায় আরও উদ্ভাবনী জাতের প্রয়োজন, যাতে গমের সরবরাহ স্থিতিশীল থাকে এবং কৃষকের আয় রক্ষা পায়।



