বাংলাদেশ সরকার আজ জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নীতি খসড়া প্রকাশ করেছে, যা ২০২৬‑২০ সময়সীমার মধ্যে এআই ব্যবহারকে সব খাতে নিয়ন্ত্রণ ও উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। এই নীতি দেশের প্রযুক্তিগত লক্ষ্যকে আওয়ামী লীগ‑নেতৃত্বাধীন সরকারের পতন ও জুলাই ২০২৪ উত্থানের পরের রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে ডিজিটাল সার্বভৌমত্বকে অগ্রাধিকার দেয়।
খসড়া নীতি দেশের উদ্ভাবন ক্ষমতা বাড়িয়ে স্বদেশীয় এআই পণ্য তৈরি, জনসেবা আধুনিকীকরণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক বৃদ্ধির লক্ষ্যে গৃহীত হয়েছে। এতে জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি ২০৪১ এবং জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের (SDGs) সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছে, যাতে প্রযুক্তি সামাজিক মঙ্গলের জন্য কাজে লাগানো যায়।
প্রথমে ২০২৪ সালে প্রণীত খসড়া চূড়ান্ত না হওয়ায় নতুন সংস্করণে ডেটা, অবকাঠামো এবং নাগরিকের অধিকার রক্ষার জন্য কঠোর ব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছে। সরকার ডিজিটাল সার্বভৌমত্বকে মূল নীতি হিসেবে তুলে ধরে, যাতে বিদেশি হস্তক্ষেপের ঝুঁকি কমে এবং দেশের তথ্য সম্পদ সুরক্ষিত থাকে।
নীতির কেন্দ্রীয় উপাদান হিসেবে বাংলা ভাষায় ভিত্তিক একটি উন্নত জাতীয় এআই সিস্টেম, অর্থাৎ বড় ভাষা মডেল (LLM) তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে। এই মডেলটি ওপেনএআই’র ChatGPT বা গুগল’র Gemini-এর মতো কাজ করবে, তবে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত ঐতিহ্যকে ডিজিটাল রূপে সংরক্ষণে বিশেষভাবে অভিযোজিত হবে। ফলে এআই প্রযুক্তি স্থানীয় প্রেক্ষাপটে প্রাসঙ্গিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে এবং বিদেশি বৌদ্ধিক সম্পদ শোষণ থেকে রক্ষা পাবে।
বৃহৎ স্কেলের উদ্ভাবনকে সমর্থন করার জন্য সরকার “ন্যাশনাল এআই কম্পিউট স্ট্র্যাটেজি” গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছে। এর অধীনে কেন্দ্রীয় গ্রাফিক্স প্রসেসিং ইউনিট (GPU) ক্রয় করে জাতীয় ডেটা সেন্টারে সংরক্ষণ করা হবে, যাতে বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও গবেষকরা একত্রে ব্যবহার করতে পারেন। এই অবকাঠামো গবেষণা ও উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত করবে।
অর্থায়নের জন্য “এআই ইনোভেশন ফান্ড” গঠন করা হবে, যা ২০২৬ থেকে ২০৩০ পর্যন্ত মোট টাকার পরিমাণ ২০০ থেকে ২৫০ কোটি টাকার মধ্যে থাকবে। ফান্ডটি গবেষণা, উন্নয়ন এবং বাণিজ্যিকীকরণে সহায়তা করবে, পাশাপাশি স্টার্টআপ ও একাডেমিক প্রতিষ্ঠানকে সার্ভার ও এক্সিলারেটরের মতো প্রয়োজনীয় হার্ডওয়্যার আমদানি করতে কর ও শুল্কে বিশেষ ছাড় দেবে।
নিয়ন্ত্রক কাঠামো ঝুঁকি-ভিত্তিকভাবে গড়ে তোলা হয়েছে, যেখানে এআই সিস্টেমকে নিষিদ্ধ, উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ, সীমিত-ঝুঁকিপূর্ণ এবং নিম্ন-ঝুঁকিপূর্ণ চারটি শ্রেণিতে ভাগ করা হবে। এই পদ্ধতি প্রযুক্তির সুবিধা বাড়াতে এবং সম্ভাব্য ক্ষতি কমাতে সহায়তা করবে।
নিষিদ্ধ তালিকায় সামাজিক স্কোরিং, অযৌক্তিক বায়োমেট্রিক নজরদারি এবং গণতন্ত্র বা নির্বাচনে হস্তক্ষেপের উদ্দেশ্যে তৈরি ডিপফেকস অন্তর্ভুক্ত। এসব ব্যবহারকে সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা হবে, যাতে নাগরিকের গোপনীয়তা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া রক্ষিত থাকে।
উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ সিস্টেমের জন্য বিশেষ অনুমোদন ও পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন হবে, আর সীমিত ও নিম্ন-ঝুঁকিপূর্ণ সেবাগুলি তুলনামূলকভাবে সহজে চালু করা যাবে। এই স্তরভিত্তিক পদ্ধতি শিল্পের স্বয়ংক্রিয়তা ও উদ্ভাবনকে নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখবে।
প্রত্যাশা করা হচ্ছে যে নীতি বাস্তবায়নের ফলে দেশীয় প্রযুক্তি খাতের বিকাশ ত্বরান্বিত হবে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি ইত্যাদি সেক্টরে এআই-চালিত সেবা উন্নত হবে। স্থানীয় ডেটা ও মডেল ব্যবহারে সেবা গ্রাহকের চাহিদার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে মানিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
সামগ্রিকভাবে, এই নীতি বাংলাদেশের এআই ক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা অর্জন, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় স্থান তৈরি এবং ডিজিটাল অধিকার রক্ষার লক্ষ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।



