বাংলাদেশ সরকার প্রতি বছর প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন ডলার আদানি পাওয়ারকে প্রদান করছে, যা প্রয়োজনীয় মূল্যের তুলনায় প্রায় অর্ধেক বেশি। জাতীয় শক্তি চুক্তি পর্যালোচনা কমিটি এই অতিরিক্ত ব্যয়ের বিশদ প্রকাশ করেছে এবং চুক্তির শর্তে ত্রুটির ইঙ্গিত দিয়েছে।
কমিটি জানায় যে ২০১৭ সালে আদানি পাওয়ারকে অনুমোদিত বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রাথমিক ট্যারিফ ছিল প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টা ০.০৮৬১ ডলার, যা একই সময়ে অন্যান্য কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় সর্বোচ্চ ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ট্যারিফ বাড়ে ০.১৪৯ ডলারে, ফলে বর্তমান মূল্য প্রাথমিক মূল্যের প্রায় ৭২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আদানি পাওয়ার চুক্তি তার নিকটতম বেসরকারি প্রতিযোগীর তুলনায় ৩৯.৭ শতাংশ প্রিমিয়াম বহন করে এবং ঐতিহ্যবাহী সরকারি চুক্তির তুলনায় ২.৭ গুণ বেশি খরচের বহন করে। একই ধরনের চুক্তিতে অন্যান্য স্থানীয় কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ট্যারিফের তুলনায় এই পার্থক্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
কমিটি বিশ্লেষণ করে দেখেছে যে এই পার্থক্য কেবল অপারেশনাল অদক্ষতার ফল নয়, বরং জ্বালানি পাস-থ্রু, মুদ্রা বিনিময় সূচক এবং স্থায়ী ক্ষমতা চার্জের নিম্ন প্রত্যাশিত ডিসপ্যাচ ভলিউমের ওপর ভিত্তি করে গঠিত। ফলে স্থায়ী খরচ কম উৎপাদন পরিমাণে ভাগ হয়ে প্রতি ইউনিটের মূল্য বাড়িয়ে দেয়।
ব্রিটিশ সওয়াস বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক এবং কমিটির সদস্য মুস্তাক খান উল্লেখ করেন, চুক্তির গঠন নিজেই সম্ভাব্য দুর্নীতির প্রাথমিক প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। আন্তর্জাতিক আইনে এমন অনিয়মপূর্ণ চুক্তি প্রায়ই দুর্নীতির সূচক হিসেবে দেখা হয়, কারণ সতর্ক সরকারি কর্মকর্তা বা রাজনীতিবিদ সাধারণত এমন শর্তে স্বাক্ষর না করে।
কমিটি আরও প্রকাশ করেছে যে প্রায় ছয়জন প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় ও বিদ্যুৎ বিভাগে কর্মরত কর্মকর্তা সরাসরি এই চুক্তি থেকে আর্থিক সুবিধা পেয়েছেন। সংশ্লিষ্ট নথিপত্রে আদানি পাওয়ার এবং সময়ের উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরের আগে বিনিময় করা চিঠিপত্রের উল্লেখ রয়েছে।
এই চিঠিপত্রগুলো চুক্তির শর্তাবলী, মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়া এবং সম্ভাব্য সুবিধা নিয়ে আলোচনা করে, যা চুক্তির স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। নথিপত্রের উপস্থিতি আদালতে দুর্নীতির প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে বলে কমিটি মন্তব্য করেছে।
মুস্তাক খানের মতে, চুক্তি বাতিল করা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। তিনি গতকাল একটি সংবাদ সম্মেলনে জোর দিয়ে বলেছিলেন, পরবর্তী সরকারকে স্পষ্টভাবে প্রতিশ্রুতি দিতে হবে যে আদানি পাওয়ার চুক্তি নিয়ে পূর্ণ আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এই দাবি দেশের বিদ্যুৎ বাজারে স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট তৈরি করে। যদি নতুন সরকার চুক্তি পুনর্বিবেচনা না করে, তবে ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ খরচের ধারাবাহিক বৃদ্ধি এবং আর্থিক ক্ষতি অব্যাহত থাকতে পারে।
সারসংক্ষেপে, জাতীয় কমিটি আদানি পাওয়ার চুক্তির অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি, সম্ভাব্য দুর্নীতি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সুবিধা সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য প্রকাশ করেছে। এই তথ্যের ভিত্তিতে সরকারী নীতি ও আইনি পদক্ষেপের দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করা হবে, যা দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহের আর্থিক ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



