আদানি গ্রুপের বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি থেকে সরকারী পর্যালোচনা কমিটির সদস্য মোশতাক হোসেন খান প্রকাশ্যভাবে জানিয়েছেন, বর্তমান শর্তে কোম্পানিটি প্রতি ইউনিট বিদ্যুতে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বেশি মূল্য পাচ্ছে। এই অতিরিক্ত মূল্য বার্ষিক ৪০‑৫০ কোটি ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৫‑৬ হাজার কোটি টাকার সমতুল্য, এবং ২৫ বছরের চুক্তির মেয়াদে মোট এক হাজার কোটি ডলারের বেশি অতিরিক্ত পেমেন্টের সম্ভাবনা তৈরি করছে।
কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ গত দেড় দশকে পাঁচ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, তবে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিল প্রায় একরাশ গুণ বেড়েছে। ফলে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ধারাবাহিকভাবে ক্ষতির মুখে রয়েছে; ২০১৫ সালে লোকসান ছিল প্রায় পাঁচ হাজার পাঁচশো কোটি টাকা, আর গত বছর এই ক্ষতি পাঁচ দশ হাজার কোটি টাকার উপরে পৌঁছেছে। এই আর্থিক অবনতি অব্যাহত থাকলে ভর্তুকি বাড়বে এবং সাধারণ জনগণের উপর আর্থিক বোঝা বৃদ্ধি পাবে।
মোশতাক হোসেন খান উল্লেখ করেন, বিদ্যমান প্রমাণের ভিত্তিতে চুক্তি বাতিল করে ক্ষতিপূরণ আদায়ের আইনি প্রক্রিয়া চালু করা সম্ভব, তবে তা রাজনৈতিক ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। তিনি সতর্ক করেন, বর্তমান সরকার নির্বাচনের আগে এই বিষয়টি সমাধান করতে পারবে না, তবে নির্বাচিত সরকার এ ধরণের পদক্ষেপ নিতে সক্ষম হতে পারে। চুক্তি বাতিলের জন্য নির্বাচনের পূর্বে প্রতিশ্রুতি নেওয়া এবং প্রয়োজনে প্রতারণা সংক্রান্ত মামলা দায়ের করা জরুরি।
বাতিলের সিদ্ধান্তের সঙ্গে সঙ্গে স্বল্পমেয়াদে বিদ্যুৎ সরবরাহে বাধা আসতে পারে। কমিটির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, চুক্তি রদ করলে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা এবং লোডশেডিংয়ের ঝুঁকি বাড়বে, তবে দীর্ঘমেয়াদে ২৫ বছরের চুক্তি থেকে উদ্ভূত আর্থিক বোঝা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। জনগণকে এই অস্থায়ী কষ্ট স্বীকার করে একতাবদ্ধ হতে হবে, তা না হলে বিদ্যুৎ সংকটের চক্র অব্যাহত থাকবে।
চুক্তিতে উল্লেখিত অতিরিক্ত মূল্য নির্ধারণের সূচকটি অস্বাভাবিক বলে কমিটি মন্তব্য করেছে। এই সূচক অনুযায়ী আদানি প্রতি ইউনিট বিদ্যুতে গড়ে ৪০‑৫০ শতাংশ বেশি মূল্য পায়, যা বাজার মূল্যের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পার্থক্য সৃষ্টি করে। এই পার্থক্যই বার্ষিক অতিরিক্ত পেমেন্টের মূল কারণ, যা দেশের বাজেটের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
পর্যালোচনা কমিটির আরেকটি মূল পর্যবেক্ষণ হল, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিল বৃদ্ধি এবং পিডিবির ক্রমবর্ধমান ক্ষতি একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। বিলের বৃদ্ধি সরাসরি ভোক্তাদের উপর অতিরিক্ত ভর্তুকি চাপিয়ে দিচ্ছে, যা আর্থিক ভারসাম্যহীনতা বাড়িয়ে তুলছে। কমিটি এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বিদ্যুৎ বাজারে দীর্ঘমেয়াদী সংকটের সম্ভাবনা উল্লেখ করেছে।
চুক্তি বাতিলের আইনি প্রক্রিয়া দ্রুততর করতে, কমিটি সিঙ্গাপুরে চলমান চুক্তি-সংক্রান্ত সালিসি মামলার সিদ্ধান্ত দ্রুত নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। বিলম্বের ফলে মামলাটি আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে, যা শেষ পর্যন্ত দেশের স্বার্থে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে।
সামগ্রিকভাবে, বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান অবস্থা এবং আদানির চুক্তির আর্থিক প্রভাব বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন, আইনি ব্যবস্থা এবং বাজার ভিত্তিক মূল্য নির্ধারণের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব। তবে এই সবকিছুই রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি এবং জনমত সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল, যা ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ বাজারের দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করবে।



