জার্মানির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডয়েচে বুন্ডেসব্যাঙ্কের ১,২৩৬ টন স্বর্ণ, যা নিউইয়র্কে ফেডারেল রিজার্ভের ভল্টে সংরক্ষিত, দেশে ফেরত আনার দাবি সম্প্রতি তীব্র হয়েছে। এই স্বর্ণের মোট মূল্য প্রায় ১৬৪ বিলিয়ন ইউরো হিসেবে অনুমান করা হয়। অর্থনীতিবিদ ইমানুয়েল মোঁখ বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতাকে প্রধান ঝুঁকি হিসেবে তুলে ধরে এই পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা জোর দিয়েছেন।
ফেডারেল রিজার্ভের নিউইয়র্ক ভল্টে বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম জাতীয় স্বর্ণভাণ্ডার হিসেবে জার্মানির এই সম্পদ রক্ষিত। স্বর্ণের পরিমাণ ১,২৩৬ টন, যা বিশ্বব্যাপী স্বর্ণের মোট সরবরাহের প্রায় এক শতাংশের সমান। মূল্যায়ন অনুযায়ী, এই স্বর্ণের আর্থিক মূল্য ১৬৪ বিলিয়ন ইউরো, যা জার্মানির মুদ্রা রিজার্ভের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ গঠন করে।
ডয়েচে বুন্ডেসব্যাঙ্কের সাবেক প্রধান গবেষক এবং বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ মোঁখের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে স্বর্ণ সংরক্ষণ “অত্যধিক ঝুঁকিপূর্ণ” হয়ে উঠেছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিবর্তনকে মূল ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এই প্রেক্ষাপটে স্বর্ণকে পুনরায় জার্মানির সীমানার মধ্যে নিয়ে আসা কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
মোঁখ হান্ডেলসব্লাটের এক সাক্ষাৎকারে জোর দিয়ে বলেছেন, বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিবেশে যুক্তরাষ্ট্রে স্বর্ণের বড় পরিমাণ রাখা জার্মানির জন্য নিরাপত্তা হুমকি তৈরি করে। তিনি বুন্ডেসব্যাঙ্ককে স্বর্ণের পুনরায় স্থানান্তরের বিষয়টি ত্বরান্বিতভাবে বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, স্বর্ণের দেশীয় সংরক্ষণ আর্থিক স্বায়ত্তশাসন বাড়াবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা ঝুঁকি কমাবে।
ফ্রিডরিখ মের্ৎসের নেতৃত্বাধীন জার্মান কোয়ালিশন সরকারের মুখপাত্র স্টেফান কর্নেলিয়াস সম্প্রতি স্বর্ণভাণ্ডার প্রত্যাহারের বিষয়টি সরকারী অগ্রাধিকারে নেই বলে জানিয়েছেন, তবে দীর্ঘমেয়াদী রিজার্ভ কৌশল নিয়ে আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে, ইউরোপের বৃহত্তম অর্থনীতির প্রতিনিধিত্বকারী আর্থিক বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদদের একটি গোষ্ঠীও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কৌশলগত নির্ভরতা হ্রাসের জন্য স্বর্ণের দেশীয় সংরক্ষণকে বাস্তবিক উপায় হিসেবে সমর্থন করে। এই পেশাদার সমর্থন মোঁখের দাবিকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্তরে শক্তি যোগায়।
স্বর্ণের পুনরায় স্থানান্তর বাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। যদি জার্মানি স্বর্ণের বড় অংশ দেশীয় ভল্টে স্থানান্তর করে, তবে স্বল্পমেয়াদে আন্তর্জাতিক স্বর্ণের সরবরাহে সাময়িক হ্রাস দেখা দিতে পারে, যা স্বর্ণের দামের ওপর ঊর্ধ্বমুখী চাপ সৃষ্টি করতে পারে। একই সঙ্গে, জার্মানির মুদ্রা রিজার্ভের গঠন পরিবর্তিত হলে ইউরোর স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগকারীর আস্থা প্রভাবিত হতে পারে।
প্রক্রিয়ার লজিস্টিক জটিলতা এবং আইনি অনুমোদনও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভল্ট থেকে স্বর্ণের শিপমেন্ট, গন্তব্যের নিরাপদ সংরক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট দেশের নিয়ন্ত্রক অনুমোদন প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা দাবি করে, যা সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বাজেটের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের রিজার্ভে স্বর্ণের হ্রাস তার আর্থিক নিরাপত্তা নেটওয়ার্কে সূক্ষ্ম পরিবর্তন আনতে পারে, যদিও এই পরিবর্তন সম্পন্ন হতে সময়সাপেক্ষ।
ভবিষ্যতে জার্মানির স্বর্ণ পুনরুদ্ধার নীতি ইউরোপীয় আর্থিক স্থিতিশীলতার একটি সূচক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। যদি বুন্ডেসব্যাঙ্ক স্বর্ণের বড় অংশ দেশে ফিরিয়ে আনে, তবে ইউরোপের অন্যান্য দেশও অনুরূপ পদক্ষেপ নিতে পারে, যা বৈশ্বিক স্বর্ণের প্রবাহে নতুন গতিবিদ্যা তৈরি করবে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের স্বর্ণ সংরক্ষণে হ্রাস তার বৈশ্বিক আর্থিক অবস্থানকে প্রভাবিত করতে পারে, তবে তা ধীরগতিতে এবং নিরাপত্তা প্রোটোকল অনুসরণ করে হবে।
সারসংক্ষেপে, জার্মানির স্বর্ণের দেশে ফেরত আনার আহ্বান বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে যুক্ত। যদিও সরকারী স্তরে এখনো এই বিষয়টি অগ্রাধিকার তালিকায় নেই, তবে অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের সমর্থন এবং বাজারের সম্ভাব্য প্রভাব এই আলোচনাকে ভবিষ্যতে তীব্র করতে পারে। স্বর্ণের দেশীয় সংরক্ষণ জার্মানির আর্থিক নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক অবস্থান উভয়ই নতুন মাত্রা পেতে পারে।



