ইজরায়েলি সামরিক বাহিনীর দুই বছরের ধারাবাহিক আক্রমণের পর গাজা উপত্যকায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও মানবিক দুর্যোগের মাত্রা কমেনি। গাজার অধিকাংশ আবাসিক কাঠামো ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষ বাড়ি ছাড়া হয়ে তাবুতে বা অস্থায়ী শিবিরে বসবাস করতে বাধ্য হয়েছে। এই পরিস্থিতি বিশেষ করে রিমাল এলাকায় অবস্থিত একটি পরিবারকে প্রভাবিত করেছে, যারা এখন একটি আবর্জনা গাছের পাশে তাবু টেনে জীবনের সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে।
আবু আমর পরিবারের শরণাপন্নের সংখ্যা ১৭‑এর বেশি, প্রতিবার স্থানান্তরের সঙ্গে সঙ্গে তাদের জীবনের জায়গা সংকুচিত হয়েছে। বর্তমানে তারা রিমালের একটি আবর্জনা ভাগারের পাশে তাবুতে বসে আছে, যেখানে বায়ু দূষণ, ময়লার গন্ধ এবং অপর্যাপ্ত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা তাদের শ্বাসযন্ত্রের রোগকে তীব্র করে তুলছে। ৬৪ বছর বয়সী আবু আমর জানান, তিনি অ্যাজমা রোগে আক্রান্ত এবং ইনহেলার ব্যবহার না করে শ্বাস নিতে পারেন না; রাতে তা বালিশের নিচে রাখেন, তবে ময়লার তীব্র গন্ধ শ্বাসনালিকে বন্ধ করলে তাকে বারবার ব্যবহার করতে হয়।
আবু আমরের পুত্রবধূ সুরাইয়া, পাঁচ সন্তানের মা, তাবুতে ন্যূনতম স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখা প্রায় অসম্ভব বলে উল্লেখ করেন। পানির তীব্র ঘাটতি তাদেরকে মাসে কয়েকবার পেটের ব্যথা ভোগ করতে বাধ্য করে। ইজরায়েলি সামরিক বাহিনীর আক্রমণের পূর্বে তাদের জীবন গুছানো ও পরিচ্ছন্ন ছিল; তবে বাইট আল‑লাহিয়া থেকে গাজা নগরীতে স্থানান্তরিত হওয়ার পর থেকে তারা এমন এক দুঃস্বপ্নের মধ্যে বসবাস করতে বাধ্য হয়েছে, যা তারা কখনো কল্পনা করেনি।
ইজরায়েলি সামরিক বাহিনীর আক্রমণে গাজায় ৭০,০০০ের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে এবং অধিকাংশ ভবন ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যদিও গত অক্টোবর মাসে যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, তবু আক্রমণ সম্পূর্ণভাবে থামেনি এবং যুদ্ধবিরতির পর থেকে চার শতাধিক শিশু নিহত হয়েছে। অনেক ফিলিস্তিনি এই ধারাবাহিকতা গাজাকে বসবাসের অযোগ্য করে তুলতে পরিকল্পিত প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন।
৪০ বছর বয়সী সেলিমের মতে, বর্জ্যের পাশে বসবাসের ফলে তাদের মানসিক অবস্থা চরম হতাশায় পৌঁছেছে। তিনি জানান, শীত ও গরমে তার সন্তানদের কষ্টের সীমা বাড়ছে; ময়লার গন্ধে খাবার গিলে ফেলতে না পারা, বমি বমি ভাবের মতো শারীরিক সমস্যাও দেখা দিচ্ছে। তীব্র বৃষ্টির সময় নর্দমার পানি তাবুর ভেতরে ঢুকে যায়, কখনো কাপড়েও ছিটে পড়ে, যা পরিষ্কার কাপড়ের অভাবে আরও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা গাজার মানবিক সংকটকে একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করছেন। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মিশরের মতো দেশগুলো গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর জন্য ইজরায়েলি সামরিক বাহিনীর অবরোধ হ্রাসের আহ্বান জানিয়েছে, তবে বাস্তবায়নে জটিলতা রয়ে গেছে। জাতিসংঘের মানবিক সংস্থা গাজার শরণার্থীদের জন্য তাত্ক্ষণিক চিকিৎসা, পরিষ্কার পানি এবং নিরাপদ আশ্রয়ের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে, যদিও সরবরাহের পথ প্রায়ই নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ে।
গাজা অঞ্চলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এখনো অনিশ্চিত। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী গৃহযুদ্ধের সময় নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক, তবে ইজরায়েলি সামরিক বাহিনীর কার্যক্রম এবং গাজার অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোর ধ্বংস এই নীতির বাস্তবায়নকে কঠিন করে তুলছে। পরবর্তী মাইলস্টোন হিসেবে, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে গাজার মানবিক অবস্থা নিয়ে বিশেষ সেশনের আয়োজনের কথা বলা হয়েছে, যেখানে গাজার পুনর্নির্মাণ ও শরণার্থীদের পুনর্বাসন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হবে।
গাজার শরণার্থীদের বর্তমান অবস্থা, স্বাস্থ্য সমস্যার তীব্রতা এবং অব্যাহত আক্রমণের পরিণতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য একটি জরুরি সতর্কতা, যা মানবিক নীতি ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগে নতুন চ্যালেঞ্জ উপস্থাপন করছে। গাজার মানুষ এখনও তাবুতে শ্বাস নিতে সংগ্রাম করছেন, আর তাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও মানবিক সহায়তার কার্যকর বাস্তবায়নের উপর।



