জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত বার্ষিক আয়কর রিটার্ন দাখিলের শেষ তারিখ নির্ধারণ করেছে। এই সময়সীমা দুইবার বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এবং সকল করদাতাকে অনলাইন ফরমে রিটার্ন জমা দিতে হবে। কাগজপত্রের স্ক্যান আপলোডের প্রয়োজন নেই, তবে আয়ের প্রমাণের মূল নথি সংরক্ষণে রাখতে হবে।
আইটি আইন ১১গ (২০২৩) অনুসারে রিটার্ন ফরমে মোট দশটি আয়ের শ্রেণি নির্ধারিত হয়েছে। প্রতিটি শ্রেণি করদাতার মোট করযোগ্য আয় নির্ধারণে ভূমিকা রাখে এবং রিটার্নে আলাদা করে উল্লেখ করতে হবে। এই শ্রেণিগুলো সঠিকভাবে পূরণ না করলে অতিরিক্ত কর বা জরিমানা আরোপিত হতে পারে।
প্রথম শ্রেণি হল চাকরির বেতন ও ভাতা। সরকারি, বেসরকারি বা যেকোনো প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তির মূল বেতন, ভাতা, বোনাস এবং ইনসেনটিভ এই ক্যাটেগরিতে অন্তর্ভুক্ত। এই আয়কে “বেতন ও ভাতা” হিসেবে রিটার্নে একত্রে উল্লেখ করতে হবে।
দ্বিতীয় শ্রেণি রিয়েল এস্টেট ভাড়া আয়। বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট, দোকান বা অন্য কোনো সম্পত্তি থেকে প্রাপ্ত মাসিক ভাড়া পুরো বছরের মোট আয় হিসেবে রিটার্নে দেখাতে হবে। ভাড়া আয় একাধিক সম্পত্তি থেকে হলেও একত্রে যোগ করে উল্লেখ করা হয়।
তৃতীয় শ্রেণি কৃষি সংক্রান্ত আয়। কৃষি জমি, ফসল, ফল, শাকসবজি, পশুপালন বা সংশ্লিষ্ট কোনো বাণিজ্যিক কৃষিকাজ থেকে প্রাপ্ত আয় এখানে অন্তর্ভুক্ত। যদিও কিছু কৃষি আয় নির্দিষ্ট শর্তে অব্যয়যোগ্য, তবে করযোগ্য অংশ রিটার্নে উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক।
চতুর্থ শ্রেণি ব্যবসা ও পেশাগত আয়। ব্যক্তিগত মালিকানাধীন ব্যবসা, ফার্ম, অথবা ডাক্তার, আইনজীবী, পরামর্শক ইত্যাদি পেশাজীবীর সেবা থেকে অর্জিত আয় এই ক্যাটেগরিতে পড়ে। ব্যবসার মুনাফা, সেবা ফি এবং অন্যান্য পেশাগত আয় একত্রে রেকর্ড করতে হবে।
পঞ্চম শ্রেণি বিদেশ থেকে প্রাপ্ত আয়। বিদেশে কাজ, পরামর্শ বা কোনো প্রকল্প থেকে অর্জিত আয়, পাশাপাশি বিদেশে থাকা সম্পদ বা বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্ত করযোগ্য আয় এখানে অন্তর্ভুক্ত। বিদেশি আয় রূপান্তর করে বাংগালিতে রিটার্নে উল্লেখ করা আবশ্যক।
ষষ্ঠ শ্রেণি মূলধনি আয়। শেয়ার বিক্রয়, সম্পত্তি বিক্রয়, রয়্যালটি, পেটেন্ট ফি এবং অন্যান্য মূলধনি সম্পদ থেকে প্রাপ্ত মুনাফা এই ক্যাটেগরিতে গুনে। মূলধনি আয় সাধারণত দীর্ঘমেয়াদী বা স্বল্পমেয়াদী লাভের ভিত্তিতে ভাগ করা হয়।
সপ্তম শ্রেণি সুদ, লভ্যাংশ ও সিকিউরিটিজ আয়। ব্যাংক ডিপোজিট, সঞ্চয়পত্র, ট্রেজারি বন্ড, শেয়ার লভ্যাংশ এবং অন্যান্য আর্থিক উপকরণ থেকে প্রাপ্ত সুদ ও মুনাফা এখানে রেকর্ড করতে হবে। এই আয়গুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে ট্যাক্স কাটার পরে রিটার্নে উল্লেখ করা হয়।
অষ্টম শ্রেণি ফার্ম বা ব্যক্তিসংঘের আয়। পার্টনারশিপ ব্যবসা, লিমিটেড পার্টনারশিপ বা অন্য কোনো ব্যক্তিসংঘের সদস্য হিসেবে অর্জিত আয় এখানে অন্তর্ভুক্ত। অংশীদারদের ভাগ অনুযায়ী আয় ভাগ করে রিটার্নে উল্লেখ করা হয়।
নবম শ্রেণি পরিবারের অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তান, স্ত্রী বা স্বামীর আয়। যদি এই সদস্যদের কোনো আলাদা করদাতা না থাকে এবং তাদের আয় করদাতার সঙ্গে যুক্ত হয়, তবে সেই আয়ের অংশ এই ক্যাটেগরিতে যোগ করতে হবে। পরিবারের সমন্বিত আয় হিসেবে রিটার্নে দেখাতে হবে।
দশম শ্রেণি অন্যান্য উৎসের আয়। রয়্যালটি, গিফট, পুরস্কার, লটারির জয় এবং অন্যান্য অপ্রচলিত আয় এই ক্যাটেগরিতে অন্তর্ভুক্ত। যদিও কিছু আয় অব্যয়যোগ্য হতে পারে, তবুও রিটার্নে সঠিকভাবে উল্লেখ করা জরুরি।
সঠিকভাবে সব দশটি শ্রেণি পূরণ করা করদাতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। রিটার্নে কোনো শ্রেণি বাদ দিলে করযোগ্য আয় কম দেখানোর অভিযোগ উঠতে পারে এবং পরবর্তীতে অতিরিক্ত কর আরোপিত হতে পারে। তাই রিটার্ন পূরণের সময় প্রতিটি ক্যাটেগরির নির্দেশনা মনোযোগ দিয়ে অনুসরণ করা উচিত।
আইটি আইন অনুযায়ী রিটার্নে ভুল তথ্য প্রদান করলে জরিমানা, দেরি শাস্তি এবং সম্ভাব্য আইনি পদক্ষেপের মুখোমুখি হতে হয়। রিটার্ন দাখিলের আগে আয়ের নথি যাচাই করে সঠিকভাবে শ্রেণিবদ্ধ করা ঝুঁকি কমায়।
ডিজিটাল রিটার্নের প্রবণতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভবিষ্যতে আরও স্বয়ংক্রিয় ডেটা সংযোগের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। ব্যাংক, বীমা ও শেয়ার বাজারের তথ্য সরাসরি সিস্টেমে লোড হলে রিটার্ন পূরণ সহজ হবে। তবে এই সুবিধা ব্যবহার করতে করদাতার ডিজিটাল সাক্ষরতা বাড়াতে হবে।
সারসংক্ষেপে, ৩১ জানুয়ারি শেষ হওয়া অনলাইন আয়কর রিটার্নে দশটি নির্ধারিত আয়ের ক্যাটেগরি সঠিকভাবে পূরণ করা বাধ্যতামূলক। সঠিক রেকর্ডিং করদাতাকে অতিরিক্ত কর থেকে রক্ষা করে এবং দেশের কর সংগ্রহে স্বচ্ছতা বজায় রাখে।



