জাতীয় পর্যায়ে জন্মগত ত্রুটি সহ নবজাতকের সংখ্যা সাম্প্রতিক মাসগুলোতে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে। ঢাকার বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে এই শিশুরা নিয়মিত চিকিৎসা গ্রহণের জন্য আসছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবেশ ও খাদ্যের গুণগত মানের অবনতি এই প্রবণতার প্রধান কারণ।
বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য বাংলাদেশ ও বিদেশের বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি বৃহৎ প্রকল্প চালু করা হয়েছে। বর্তমানে গবেষণার প্রায় সত্তর শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং বাকি অংশের সমাপ্তির পর ফলাফল আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে। এই উদ্যোগের লক্ষ্য জন্মগত ত্রুটির মূল কারণগুলো চিহ্নিত করে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
গবেষণা দলটি খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশগত দূষণ এবং পুষ্টিকর উপাদানের ঘাটতি ইত্যাদি বিষয় বিশ্লেষণ করেছে। তাদের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ফলিক অ্যাসিডের অপর্যাপ্ত উপস্থিতি এবং খাদ্যে ভেজাল যুক্ত হওয়া শিশুর বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এছাড়া, পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা বিশেষ করে ঢাকার বাইরে, যেমন খুলনা ও অন্যান্য জেলায়, অত্যন্ত উচ্চ।
আর্সেনিকের অতিরিক্ত গ্রহণের ফলে গর্ভবতী মা ও ভ্রূণের স্বাস্থ্যের ওপর সরাসরি ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে। একই সঙ্গে, সবজি ও মাছের উৎপাদনে ব্যবহৃত বিষাক্ত রসায়নিক পদার্থও উদ্বেগের বিষয়। এই রসায়নিকগুলো খাবারের তাজা রূপ বজায় রাখতে সাহায্য করে, ফলে পচন প্রক্রিয়া ধীর হয় এবং পণ্য দীর্ঘ সময় বাজারে থাকে।
তবে, গবেষকরা উল্লেখ করেছেন যে কিছু খাদ্য সামগ্রী কয়েক সপ্তাহ বা মাস আগে তৈরি হয়ে থাকে, যদিও সেগুলোকে সর্বোচ্চ ৭২ ঘণ্টার মধ্যে বিক্রি করা উচিত। মুনাফা বাড়ানোর জন্য উৎপাদকরা এই পণ্যগুলোকে দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করে বিক্রি করে আসছেন। ফলে, ভোক্তারা অজান্তেই পুরনো ও সম্ভাব্যভাবে দূষিত খাবার গ্রহণ করছেন।
অতিরিক্তভাবে, রঙ ও সংরক্ষণকারী পদার্থের মিশ্রণ দিয়ে খাবারকে আকর্ষণীয় ও দীর্ঘস্থায়ী করা হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে, ফরমালিনের মতো সংরক্ষণকারীও ব্যবহার করা হয়, যা মানব স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এই ধরনের অনিয়মিত প্রক্রিয়া প্রধানত ফুড ইন্ডাস্ট্রি, অলিগলি ও গ্রামাঞ্চলের ছোটখাটো কারখানায় দেখা যায়।
ক্ষেত্র সমীক্ষায় গবেষক দল সরেজমিনে এমন খাদ্য সামগ্রী ও রসায়নিকের উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে। তারা উল্লেখ করেন, এই ধরণের পণ্য গর্ভবতী মায়ের খাবার তালিকায় প্রবেশ করলে শিশুর জন্মগত ত্রুটির ঝুঁকি বাড়ে। ত্রুটিযুক্ত শিশুরা শারীরিক ও মানসিক বিকাশে বাধা পায়, যা দীর্ঘমেয়াদে পরিবার ও সমাজের ওপর অতিরিক্ত বোঝা সৃষ্টি করে।
শিশুদের পাশাপাশি, এই বিষাক্ত খাবার সকল বয়সের মানুষের জটিল রোগের হার বাড়িয়ে তুলছে। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশগত দূষণ ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস হৃদরোগ, ক্যান্সার ও অন্যান্য ক্রনিক রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই, সমস্যার সমাধান কেবল নবজাতকের জন্য নয়, পুরো জনসংখ্যার জন্য জরুরি।
চিকিৎসা খরচের দিক থেকে দেখা যায়, জন্মগত ত্রুটি যুক্ত শিশুর চিকিৎসা ব্যয়বহুল। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, শিশু হাসপাতালসহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে রোগী ভর্তি হয়, তবে মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র পরিবারের জন্য এই খরচ বহন করা কঠিন। ফলে, অনেক পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ে এবং সঠিক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়।
এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর ত্বরিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কঠোর মানদণ্ড প্রয়োগ, আর্সেনিক দূষণমুক্ত পানির সরবরাহ এবং ফলিক অ্যাসিড সমৃদ্ধ খাবারের প্রচার জরুরি। পাশাপাশি, অনিয়মিত উৎপাদন ও বিক্রয়ের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা শক্তিশালী করা উচিত।
জনসাধারণের সচেতনতা বৃদ্ধিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। গর্ভবতী মায়েদের জন্য পুষ্টিকর খাবার নির্বাচন, নিরাপদ পানির ব্যবহার এবং খাবারের গুণগত মান যাচাই করার প্রশিক্ষণ প্রদান করা যেতে পারে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মিডিয়ার মাধ্যমে এই বিষয়গুলোকে ব্যাপকভাবে প্রচার করা হলে সমস্যার বিস্তার রোধ করা সম্ভব হবে।
অবশেষে, গবেষণার চূড়ান্ত ফলাফল আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হলে নীতি নির্ধারক ও স্বাস্থ্য কর্মীরা সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে কার্যকর পরিকল্পনা তৈরি করতে পারবেন। এই তথ্যভিত্তিক পদক্ষেপগুলোই ভবিষ্যতে জন্মগত ত্রুটি যুক্ত শিশুর সংখ্যা কমাতে সহায়তা করবে।
আপনার পরিবারে বা পরিচিতদের মধ্যে যদি কোনো গর্ভবতী মা বা নবজাতক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগে থাকেন, তাহলে কি আপনি স্থানীয় স্বাস্থ্য কেন্দ্রে পরামর্শ নেওয়ার কথা বিবেচনা করছেন?



