ইন্টারপোলের অভ্যন্তরীণ তথ্য ফাঁসের মাধ্যমে রাশিয়া কীভাবে আন্তর্জাতিক পুলিশ নেটওয়ার্ককে ব্যবহার করে বিদেশে থাকা সমালোচকদের গ্রেফতার করার চেষ্টা করছে তা প্রথমবারের মতো প্রকাশিত হয়েছে। এক গোপন সূত্রের কাছ থেকে প্রাপ্ত হাজারো ফাইলের তথ্য বিবিসি ও ফরাসি অনুসন্ধানী মিডিয়া ডিসক্লোজকে সরবরাহ করা হয়।
ফাইলগুলোতে দেখা যায় রাশিয়া রাজনৈতিক বিরোধী, ব্যবসায়ী ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগে ইন্টারপোলের রেড নোটিস ও রেড ডিফিউশন পাঠাচ্ছে। এই তালিকায় নাম যুক্ত হওয়া ব্যক্তিরা প্রায়শই তাদের দেশ বা আশ্রয়প্রাপ্ত দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে গ্রেফতার অনুরোধের শিকার হন।
বিশেষ করে ইউক্রেনের পূর্ণাঙ্গ আক্রমণের পর ইন্টারপোল রাশিয়ার অনুরোধে অতিরিক্ত যাচাই প্রক্রিয়া চালু করেছিল, যাতে সংঘাতের সময় বা পরবর্তী সময়ে ব্যক্তিগত লক্ষ্যবস্তু করার সম্ভাবনা কমে। তবে ফাঁস হওয়া নথিতে দেখা যায় ২০২৫ সালে কিছু কঠোর ব্যবস্থা গোপনে বাতিল করা হয়, ফলে সিস্টেমের অপব্যবহার অব্যাহত থাকে।
ইন্টারপোলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী হাজারো গুরুতর অপরাধী গ্রেফতার হয় এবং এ সংস্থার অপব্যবহার রোধে বিভিন্ন প্রক্রিয়া শক্তিশালী করা হয়েছে। তবু রেড নোটিসের প্রভাব ব্যক্তিগত জীবনে কতটা গভীর তা তারা স্বীকার করে।
একজন রাশিয়ান ব্যবসায়ী, যিনি ফাঁস হওয়া নথিতে নামযুক্ত, তার মতে রেড নোটিস পাওয়া মাত্রই তার জীবন সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হয়ে যায়। তিনি ফ্রান্সে আশ্রয় নেওয়ার পর রেড ডিফিউশন দ্বারা লক্ষ্যবস্তু হন এবং তার বিকল্প দু’টি ছিল—স্থানীয় পুলিশে অভিযোগ করা অথবা নোটিসের প্রভাবের মুখোমুখি হওয়া।
ইন্টারপোলের রেড নোটিস হল ১৯৬টি সদস্য দেশের কাছে একসাথে গ্রেফতার অনুরোধ পাঠানো একটি সতর্কতা, যেখানে রেড ডিফিউশন নির্দিষ্ট কোনো দেশের জন্যই প্রেরণ করা হয়। এই প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়াতে তৈরি, তবে অপব্যবহারের ঝুঁকি সর্বদা বিদ্যমান।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, রাশিয়ার এই কৌশল কেবল ইউক্রেনের যুদ্ধের পরই নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর ওপর আস্থা ক্ষয় করে। একটি ইউরোপীয় নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ বলেন, “যদি কোনো দেশ ইন্টারপোলের প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক লক্ষ্যবস্তু করার জন্য ব্যবহার করে, তবে তা আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলাকে দুর্বল করে।”
ইন্টারপোলের অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনা দেখায়, রাশিয়ার অনুরোধের বিরুদ্ধে গৃহীত আপত্তি অধিকাংশ ক্ষেত্রে সফল হয়েছে, ফলে অন্য দেশের তুলনায় বেশি সংখ্যক মামলা বাতিল হয়েছে। এই প্রবণতা ইন্টারপোলের তদারকি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
রাশিয়া সরকার এই অভিযোগকে অস্বীকার করে, এবং দাবি করে যে তার সকল অনুরোধ বৈধ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অংশ। তবু ফাঁস হওয়া ডেটা দেখায় যে, রেড নোটিসের মাধ্যমে রাজনৈতিক বিরোধী ও সমালোচকদের লক্ষ্যবস্তু করা একটি পদ্ধতিগত কৌশল।
ইন্টারপোলের মুখপাত্রের মতে, ভবিষ্যতে অপব্যবহার রোধে আরও স্বচ্ছতা ও তদারকি ব্যবস্থা প্রয়োগ করা হবে। তবে গোপন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে কিছু কঠোর নীতি হঠাৎই বাতিল করা হয়, যা সিস্টেমের দুর্বলতা প্রকাশ করে।
এই ঘটনা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কিছু দেশ ইতিমধ্যে রাশিয়ার ইন্টারপোল অনুরোধের উপর অতিরিক্ত পর্যালোচনা শুরু করেছে এবং আশ্রয়প্রাপ্ত ব্যক্তিদের রেড নোটিসের প্রভাব কমাতে সহায়তা প্রদান করছে।
সারসংক্ষেপে, ইন্টারপোলের রেড নোটিস ব্যবস্থার অপব্যবহার রাশিয়া কীভাবে তার সমালোচকদের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে লক্ষ্যবস্তু করে তা স্পষ্ট হয়েছে। এই বিষয়টি আন্তর্জাতিক আইনি সহযোগিতা ও মানবাধিকার রক্ষার জন্য নতুন নীতি প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে।



