ওডিশার সম্বলপুর জেলার মোদিপাড়া গ্রাম থেকে ৭৫ বছর বয়সী বাবু লোহার, তার ৭০ বছর বয়সী স্ত্রীর হঠাৎ স্ট্রোকের পর, প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত কটকের এসসিবি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে পৌঁছানোর জন্য নিজের ভ্যান চালিয়ে গেছেন। রোগীর অবস্থা তীব্র হওয়ায় স্থানীয় চিকিৎসকের পরামর্শে দ্রুত বিশেষজ্ঞ সেবার প্রয়োজন হয়। তবে আর্থিক সংকটের কারণে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করা সম্ভব না হওয়ায় বাবু লোহার স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিকল্প খুঁজে নেন।
স্থানীয় চিকিৎসক জ্যোতি (স্ত্রীর নাম)কে কটকের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন, যেখানে স্ট্রোকের প্রাথমিক ব্যবস্থাপনা এবং পরবর্তী পুনর্বাসন সম্ভব। পরিবারিক সম্পদ সীমিত হওয়ায় সাধারণ অ্যাম্বুলেন্সের খরচ বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে বাবু লোহার নিজের ভ্যানকে অস্থায়ী অ্যাম্বুলেন্সে রূপান্তর করার সিদ্ধান্ত নেন।
ভ্যানের পেছনের অংশে পুরোনো তোষক (স্ট্রেচার) বসিয়ে রোগীর শয্যা হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তোষকটি নিরাপদে স্থাপন করার জন্য অতিরিক্ত বস্ত্র ও বালিশ ব্যবহার করা হয়, যাতে যাত্রার সময় জ্যোতির শারীরিক কষ্ট কমে। এই ব্যবস্থা দিয়ে বাবু লোহার রাতারাতি গন্তব্যের পথে রওনা হন।
সম্বলপুর থেকে কটক পর্যন্ত প্রায় ৯ দিনের দীর্ঘ যাত্রা হয়। দিনভর ভ্যান চালিয়ে গন্তব্যের দিকে অগ্রসর হন, আর রাতের বিশ্রাম রাস্তার ধারের ছোট দোকান বা ফাঁকা জায়গায় নেন। এই ধরনের দীর্ঘমেয়াদী যাত্রা রোগীর শারীরিক অবস্থা বজায় রাখতে বিশেষ যত্নের প্রয়োজন।
কটকের এসসিবি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে পৌঁছানোর পর জ্যোতি দুই মাসের ধারাবাহিক চিকিৎসা পান। স্ট্রোকের পরবর্তী পর্যায়ে শারীরিক থেরাপি, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ এবং রক্তের গ্লুকোজ পর্যবেক্ষণসহ বিভিন্ন মেডিকেল সেবা প্রদান করা হয়। চিকিৎসা শেষে ১৯ জানুয়ারি দম্পতি বাড়ির পথে রওনা হন।
বাড়ি ফেরার পথে চৌদ্বার এলাকায় একটি গাড়ির ধাক্কা ঘটে, যার ফলে ভ্যানের গঠন ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং জ্যোতি আবারও গুরুতর আঘাত পায়। দুর্ঘটনার পর নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে তাকে জরুরি ভর্তি করা হয়। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তার অবস্থা স্থিতিশীল হয় এবং পুনরায় যাত্রা প্রস্তুত করা হয়।
বাবু লোহার জানান, “আমাদের আর কেউ নেই, আমরা দুজনই একে অপরের উপর নির্ভরশীল” এবং এই কঠিন সময়ে পারস্পরিক সমর্থনই একমাত্র সান্ত্বনা। চিকিৎসা কেন্দ্রে ডা. বিকাশ রোগীর শারীরিক যত্নের পাশাপাশি আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন, যাতে দম্পতি নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারেন। এই সহায়তা পরিবারকে অতিরিক্ত আর্থিক চাপ থেকে রক্ষা করে।
দম্পতির এই আত্মত্যাগপূর্ণ প্রচেষ্টা স্থানীয় সমাজে প্রশংসা ও সমর্থন অর্জন করে। প্রতিবেশী ও গ্রামবাসীরা বাবু লোহারকে উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করে, ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধের গুরুত্ব তুলে ধরেন। গল্পটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কর্মীদের মনেও গভীর প্রভাব ফেলে, যাদের কাজের প্রতি নতুন উদ্যম যোগায়।
স্ট্রোকের মতো জরুরি রোগে সময়মত চিকিৎসা পাওয়া রোগীর পুনরুদ্ধারের মূল চাবিকাঠি। গ্রামীণ এলাকায় জরুরি পরিবহন সুবিধার অভাব রোগীর জীবনে বড় পার্থক্য তৈরি করতে পারে। তাই স্থানীয় স্বয়ংচালিত গাড়ি, ভ্যান বা সাইকেলকে অস্থায়ী অ্যাম্বুলেন্সে রূপান্তর করার উদ্যোগকে উৎসাহিত করা উচিত।
এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নেওয়া যায় যে, পরিবারিক সমর্থন ও সৃজনশীল সমাধান রোগীর জীবন রক্ষা করতে পারে। স্ট্রোকের প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সম্ভব হলে নিকটস্থ পরিবহন ব্যবস্থা ব্যবহার করা জরুরি। আপনার বা আপনার পরিচিতের কোনো জরুরি স্বাস্থ্য সমস্যায় কী ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন, তা নিয়ে ভাবা উচিত।



