মার্ক টালি, ১৯০ বছর বয়সী ব্রিটিশ সাংবাদিক, রবিবার ভারতের রাজধানী নিউ দিল্লির একটি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঙালিদের কণ্ঠস্বরকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার জন্য তিনি আন্তর্জাতিক মিডিয়ার অন্যতম মুখ হিসেবে স্বীকৃত ছিলেন। তার মৃত্যু সংবাদটি আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতা ও দক্ষিণ এশীয় কূটনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে ধরা পড়েছে।
মার্ক টালির জন্ম ২৪ অক্টোবর ১৯৩৫ সালে কলকাতা, তালীগঞ্জে হয়। তার বাবা ব্যবসায়ী ছিলেন এবং টালি শৈশবকাল কলকাতায় কাটিয়েছেন। নয় বছর বয়সে তিনি ইংল্যান্ডে স্থানান্তরিত হন, যেখানে তিনি স্কুল ও কলেজের শিক্ষা সম্পন্ন করেন। সামরিক সেবার জন্য তিনি সাময়িকভাবে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন, তবে তা তার পছন্দ না হওয়ায় ত্যাগ করে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস ও ধর্ম বিষয়ের অধ্যয়ন শুরু করেন, যদিও শেষ পর্যন্ত স্নাতক সম্পন্ন করতে পারেননি।
ব্রিটিশ সম্প্রচার সংস্থা বিবিসির (Bbc) দক্ষিণ এশিয়া প্রতিবেদক হিসেবে কাজের সময় টালি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামকে ঘিরে আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি সীমান্তবর্তী শরণার্থী শিবির, গ্রামাঞ্চলের বাঙালিদের কষ্ট এবং যুদ্ধের বাস্তব চিত্রকে সরাসরি সংবাদে তুলে ধরেন, যা বিশ্বজনমতকে বাঙালিদের পক্ষে ঘুরিয়ে দেয়। তার প্রতিবেদনগুলো আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মঞ্চে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে, ফলে স্বাধীনতার স্বীকৃতির জন্য বিভিন্ন দেশ ও সংস্থার নীতি পরিবর্তনে সহায়তা করে।
তার কাজের স্বীকৃতিতে বাংলাদেশ সরকার তাকে ‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা’ প্রদান করে। একই সঙ্গে ভারত সরকারও টালিকে পদ্মশ্রী ও পদ্মভূষণ সম্মাননা দিয়ে সম্মানিত করে এবং তিনি স্বদেশ থেকে নাইটহুড (নাইটহুড) খেতাব অর্জন করেন। এই সম্মানগুলো তার সাংবাদিকতার নৈতিকতা ও আন্তর্জাতিক মানবিক দায়িত্বের প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত হয়।
বিবিসি থেকে অবসর নেওয়ার পর টালি ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকতা চালিয়ে যান এবং বহু বইয়ের লেখক হিসেবেও পরিচিতি লাভ করেন। তার রচনাগুলো ইতিহাস, ধর্ম এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সংযোগস্থলে বিশ্লেষণমূলক দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে, যা পাঠকদের মধ্যে গভীর চিন্তাভাবনা উত্সাহিত করে।
একজন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক উল্লেখ করেন, “মার্ক টালির মতো সাংবাদিকদের প্রতিবেদনই কখনো কখনো কূটনৈতিক নীতির চেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়; তার কাজ স্বাধীনতার জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন গড়ে তুলতে মূল চালিকাশক্তি ছিল।” টালির মৃত্যুর পর, দক্ষিণ এশিয়ার মিডিয়া পরিবেশে তার প্রভাব এখনও অনুভূত হয়, বিশেষ করে স্বাধীনতা সংগ্রামের নথি ও স্মৃতিচারণে তার রেকর্ডকে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
মার্ক টালির পরিবারে তার স্ত্রী মার্গারেট এবং চার সন্তান লন্ডনে বসবাস করেন, যদিও টালি নিজে শেষ দিনগুলো ভারতেই কাটিয়েছেন। তার মৃত্যুর সংবাদটি আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর শিরোনাম হয়ে ওঠে এবং বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক মিশনের পক্ষ থেকে শোক প্রকাশের বার্তা আসে। টালির অবদানকে স্মরণ করে, বাংলাদেশ সরকার এবং ভারত সরকার উভয়ই তার কাজের প্রতি সম্মান জানিয়ে ভবিষ্যতে সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও নৈতিকতার গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করেছে।
মুক্তিযুদ্ধের ৫৫তম বার্ষিকীর নিকটে টালির মৃত্যু, বাঙালি জাতির স্বাধীনতা সংগ্রামের স্মরণে নতুন এক দৃষ্টিকোণ যোগ করে। তার জীবন ও কর্ম ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতার নীতি, মানবিক দায়িত্ব এবং কূটনৈতিক প্রভাবের মডেল হিসেবে রয়ে যাবে।



