ফ্রান্স সরকার ঘোষণা করেছে যে ১৫ বছরের নিচের বয়সের শিশু ও কিশোরদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা হবে। এই সিদ্ধান্তের পেছনে লক্ষ্য হল অনলাইন প্ল্যাটফর্মের অ্যালগরিদম ও বাণিজ্যিক কৌশল থেকে তরুণ মস্তিষ্ক ও আবেগকে রক্ষা করা। আইনটি নতুন শিক্ষাবর্ষের আগে, অর্থাৎ সেপ্টেম্বরের শুরুতে কার্যকর করা হবে এবং সংশ্লিষ্ট বিধান দ্রুত পার্লামেন্টে অনুমোদনের প্রক্রিয়া চলছে।
প্রেসিডেন্ট এমমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এই নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে জোর দিয়ে বলেছেন যে শিশুরা কোনো বাণিজ্যিক পণ্যে রূপান্তরিত হওয়া উচিত নয়, তা আমেরিকান প্ল্যাটফর্ম হোক বা চীনা অ্যালগরিদম। তিনি উল্লেখ করেন, “শিশু ও কিশোরের মস্তিষ্ক বিক্রির বস্তু নয়, তাদের আবেগও তেমনই।” এই বক্তব্যের ভিত্তিতে সরকার সামাজিক মিডিয়ার বয়স যাচাই প্রক্রিয়াকে কঠোর করে তোলার পরিকল্পনা করেছে।
বয়স যাচাই ব্যবস্থা না থাকায় বর্তমানে যে কোনো ব্যবহারকারী সহজেই ভুল জন্মতারিখ দিয়ে প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করতে পারে, এটাই প্রধান উদ্বেগের বিষয়। ফরাসি সংসদে রেনেসাঁ পার্টির সদস্য লর মিলার এই সমস্যার সমাধানে ইউরোপীয় ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্ট (DSA) কঠোরভাবে প্রয়োগের দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, DSA-র অধীনে প্ল্যাটফর্মগুলোকে ব্যবহারকারীর প্রকৃত বয়স যাচাই বাধ্যতামূলক করা হবে, যা বাস্তবায়নে বড় পরিবর্তন আনবে।
ফ্রান্সের এই পদক্ষেপের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যান্য দেশও অনলাইন নিরাপত্তা বাড়াতে নতুন আইন প্রণয়ন করছে। উদাহরণস্বরূপ, অস্ট্রেলিয়া গত ডিসেম্বর মাসে একটি আইন পাস করেছে, যার মাধ্যমে ১৬ বছরের নিচের শিশুদের ইনস্টাগ্রাম, টিকটক, ফেসবুকসহ প্রধান সামাজিক নেটওয়ার্কে অ্যাকাউন্ট তৈরি করা নিষিদ্ধ। এই ধরনের আন্তর্জাতিক প্রবণতা ফ্রান্সের নীতিকে সমর্থনকারী পরিবেশ তৈরি করেছে।
নতুন বিধান অনুসারে, ১৫ বছরের নিচের ব্যবহারকারীদের জন্য সামাজিক মিডিয়ার প্রবেশাধিকার সম্পূর্ণভাবে ব্লক করা হবে। আইনটি প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে বাধ্য করবে যে কোনো ব্যবহারকারীকে সেবা প্রদান করার আগে স্বয়ংক্রিয় বয়স যাচাই সিস্টেম চালু করতে। এই সিস্টেমের মাধ্যমে ভুল তথ্য দিয়ে প্রবেশের প্রচেষ্টা রোধ করা সম্ভব হবে এবং অভিভাবক ও শিক্ষকদের জন্য পর্যবেক্ষণ সহজ হবে।
ফ্রান্সের সরকার উল্লেখ করেছে যে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার সময় কোনো বিভ্রান্তি না থাকে, এজন্য বয়স যাচাই প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নির্ভুলতা নিশ্চিত করা হবে। এছাড়া, প্ল্যাটফর্মগুলোকে ব্যবহারকারীর ডেটা সুরক্ষার জন্য অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এই পদক্ষেপগুলোকে সমর্থনকারী সংস্থা গুলো দাবি করে যে, তরুণ প্রজন্মের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব কমাতে এই ধরনের কঠোর নীতি অপরিহার্য।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, সামাজিক মিডিয়ার অ্যালগরিদম ব্যবহারকারীর মনোযোগ ধরে রাখতে এবং বিজ্ঞাপন আয় বাড়াতে ডিজাইন করা হয়, যা তরুণদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে। ফ্রান্সের এই আইন এই ঝুঁকিগুলোকে কমিয়ে আনার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অধিকন্তু, ফ্রান্সের আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডিজিটাল নীতি গোষ্ঠীও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করছে। তারা নিশ্চিত করতে চায় যে, সব সদস্য রাষ্ট্রে সমানভাবে বয়স যাচাই সিস্টেম প্রয়োগ করা হবে এবং প্ল্যাটফর্মগুলোকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে আনতে হবে।
এই নীতি বাস্তবায়নের জন্য ফ্রান্সের সরকার ইতিমধ্যে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আলোচনা চালু করেছে। তারা চায় যে, প্ল্যাটফর্মগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বয়স যাচাইয়ের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করে, যাতে মানবিক ত্রুটি কমে এবং দ্রুত সেবা প্রদান করা যায়।
সামাজিক মিডিয়া ব্যবহার নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি, সরকার শিক্ষাবিদ ও অভিভাবকদের জন্য সচেতনতা প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করার পরিকল্পনা করেছে। এই প্রশিক্ষণগুলোতে ডিজিটাল সাক্ষরতা, অনলাইন নিরাপত্তা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের রক্ষার উপায় নিয়ে আলোচনা হবে।
ফ্রান্সের এই উদ্যোগের ফলে, দেশের তরুণ প্রজন্মের অনলাইন অভিজ্ঞতা পরিবর্তিত হতে পারে। বিশেষ করে, স্কুলে ডিজিটাল শিক্ষা ও নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারের ওপর জোর বাড়বে। একই সঙ্গে, প্ল্যাটফর্মগুলোকে নতুন নিয়ম মেনে চলতে অতিরিক্ত প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ করতে হবে।
সামগ্রিকভাবে, ফ্রান্সের এই কঠোর নীতি সামাজিক মিডিয়ার অতিরিক্ত ব্যবহার ও বয়স যাচাইয়ের ঘাটতি মোকাবেলায় একটি মডেল হিসেবে কাজ করতে পারে। অন্যান্য দেশও এই ধরণের নিয়ম অনুসরণ করলে, গ্লোবাল ডিজিটাল পরিবেশে শিশু ও কিশোরদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সহজ হবে।
ফ্রান্সের সরকার এই আইনকে দ্রুত কার্যকর করার জন্য পার্লামেন্টে বিশেষ আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করেছে। নতুন শিক্ষাবর্ষের আগে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে, ১৫ বছরের নিচের ব্যবহারকারীরা সামাজিক মিডিয়ার প্রবেশাধিকার থেকে বাদ পড়বে এবং তাদের নিরাপদ বিকল্প বিকাশের দিকে মনোযোগ দেওয়া হবে।



