ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের দিন যত কাছাকাছি আসছে, অনলাইন জুয়া প্ল্যাটফর্মের কার্যক্রম তত তীব্রতর হচ্ছে। দেশব্যাপী বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে ১৬টি প্রধান রাজনৈতিক দলের সরকার গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে বাজি ধরা হচ্ছে। ভোটের ফলাফল, বিশেষত ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটে কোন দল সর্বাধিক আসন পাবে, তা নির্ধারণের জন্য এই সেবা প্রদান করা হচ্ছে।
অ্যাপগুলোতে ব্যবহারকারীদেরকে দলগুলোর জয়-পরাজয়, অথবা সর্বোচ্চ আসন‑প্রাপ্তি ভিত্তিক বাজি রাখতে বলা হয়। সমানসংখ্যক আসন পেলে সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া দলের পক্ষে বাজি স্বয়ংক্রিয়ভাবে জয়ী ধরা হয়। ফলে ভোটের ফলাফলকে নির্ভুলভাবে পূর্বাভাস দিতে পারে এমন কোনো জোটের বিকল্প এখানে নেই; শুধুমাত্র একক দলের পক্ষে‑বিপক্ষে বাজি সম্ভব।
বাজারে দেখা যাচ্ছে, নামের প্রথম অক্ষর ‘ওয়ান’ দিয়ে শুরু হওয়া একটি অ্যাপের মধ্যে এই ধরনের সেবা সক্রিয়। একই সঙ্গে ‘পলিবেট’ নামে আরেকটি অপশনেও নির্বাচনী দলগুলোর জয়ের পক্ষে‑বিপক্ষে বাজি রাখা যায়। অতিরিক্তভাবে ‘বেট’, ‘লাইন’, ‘মেল’ এবং ‘ডিবি’ দিয়ে শুরু হওয়া চারটি অ্যাপেও অনুরূপ বিকল্প উপলব্ধ। এসব অ্যাপের মূল লক্ষ্য হল ব্যবহারকারীকে নির্বাচনের ফলাফলের ওপর আর্থিক লাভের সুযোগ প্রদান করা।
বেটিং সিস্টেমে দেখা যায়, যে দলগুলোকে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে গণ্য করা হয়, তাদের বিপক্ষে বাজি ধরলে বেশী রিটার্ন অফার করা হয়। অন্যদিকে, কম সম্ভাব্য দলগুলোর পক্ষে বাজি ধরলে রিটার্ন কম থাকে। এই ধরনের অডস কাঠামো ব্যবহারকারীকে উচ্চ ঝুঁকি ও উচ্চ পুরস্কারযুক্ত পছন্দের মুখোমুখি করে।
বাংলাদেশে যেকোনো রূপে জুয়া নিষিদ্ধ। ২০২০ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টের রায়ে টাকার বিনিময়ে সব ধরনের জুয়া সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। এরপর ২০২৫ সালের ২১ মে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশে অনলাইন জুয়া ও সংশ্লিষ্ট সেবা নিষিদ্ধের বিধান যুক্ত করা হয়। এই অধ্যাদেশের ধারা ২০-এ স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, সাইবার স্পেসে জুয়া সংক্রান্ত পোর্টাল, অ্যাপ, ডিভাইস তৈরি, পরিচালনা, অংশগ্রহণ, সহায়তা, প্রচার বা বিজ্ঞাপন করা অপরাধ।
ধারার অধীনে অপরাধীকে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড অথবা এক কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা হতে পারে। এই শাস্তি প্রয়োগের উদ্দেশ্য হল অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে আর্থিক লেনদেনের গোপনীয়তা ভেঙে ফেলা এবং জনসাধারণের ক্ষতি রোধ করা।
প্রতিবেদন অনুসারে, এই জুয়া অ্যাপগুলো গুগল প্লে‑স্টোরে তালিকাভুক্ত নয়। ব্যবহারকারীদেরকে বিভিন্ন ওয়েব ব্রাউজার থেকে সরাসরি ডাউনলোড করতে হয়। একবার ইনস্টল করার পর, মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট বা নির্দিষ্ট এজেন্টের মাধ্যমে ব্যালেন্স টপ‑আপ করা সম্ভব, যা জুয়া চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় তহবিল সরবরাহ করে।
সাইবার পুলিশ সেন্টার, যা পুলিশ অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এর অধীনে কাজ করে, অনলাইন জুয়া বন্ধ করার জন্য বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করেছে। এই টাস্কফোর্স বিভিন্ন সময়ে জুয়া সংক্রান্ত অ্যাপ ও ওয়েবসাইটের অপারেটরদের গ্রেপ্তার করেছে এবং ডেটা সিলেকশন চালিয়ে আসছে।
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে জোরালো সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে যে, অনলাইন জুয়া প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারকারীকে আইনি শাস্তির মুখে ফেলবে। সরকার সংশ্লিষ্ট সকল সাইট ও অ্যাপের আইনি ব্যবস্থা ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি, ব্যবহারকারীদেরকে জুয়া সংক্রান্ত প্রতারণা থেকে রক্ষা করার জন্য জনসচেতনতা কর্মসূচি চালু করেছে।
সংসদ নির্বাচনের সময়সীমা নিকটবর্তী হওয়ায়, ভোটের ফলাফলের ওপর বাজি ধরার প্রবণতা বাড়ছে বলে অনুমান করা হচ্ছে। তবে আইনগত বাধা ও সাইবার নিরাপত্তা সংক্রান্ত কঠোর পদক্ষেপের ফলে এই ধরনের অবৈধ কার্যক্রমের বিস্তার সীমিত রাখতে সরকারের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
অবৈধ জুয়া প্ল্যাটফর্মের ব্যবহারকারী ও অপারেটরদের বিরুদ্ধে আইনি কার্যক্রম ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি, সাইবার নিরাপত্তা সংস্থাগুলি ব্যবহারকারীদেরকে অনলাইন জুয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করতে এবং বৈধ আর্থিক লেনদেনের বিকল্প প্রদান করতে কাজ করবে।



