কিউবার কূটনৈতিক মিশন থেকে জানানো হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জলদস্যু কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছে। এই দাবি কিউবার রাষ্ট্রদূত কার্লোস দে সেসপেডেসের মুখে রোববার, ২৫ জানুয়ারি প্রকাশিত হয়। তথ্যটি কাতার ভিত্তিক আল জাজিরার প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক পদক্ষেপের ফলে কিউবার তেল সরবরাহের ওপর প্রভাবের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতি অনুসরণে ভেনেজুয়েলা থেকে কিউবার দিকে তেলের প্রবাহ প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশাসন ইতিমধ্যে ঘোষণা করেছে যে, ভেনেজুয়েলার তেল আর কিউবার বাজারে প্রবেশ করবে না। এই সিদ্ধান্তের ফলে কিউবার তেল সরবরাহের মূলধারায় বড় পরিবর্তন ঘটেছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী ভেনেজুয়েলার তেলবাহী জাহাজকে আটক করেছে, যা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে কিছু বিশ্লেষক জলদস্যুতা হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যদিও যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি বৈধ শাসনবিধি রক্ষা হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে।
কিউবা এবং ভেনেজুয়েলা দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ক বজায় রেখেছে। ভেনেজুয়েলার তেল কিউবার জ্বালানি চাহিদার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ গঠন করত, ফলে এই সরবরাহের ব্যাঘাত দেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে কিউবার অর্থনৈতিক অবস্থা ইতিমধ্যে সংকটে রয়েছে, তাই তেলের ঘাটতি অতিরিক্ত চ্যালেঞ্জের জন্ম দেবে।
এই পরিস্থিতিতে কিউবা মেক্সিকোসহ অন্যান্য দেশ থেকে তেল আমদানি চালিয়ে যাচ্ছে। বিকল্প সরবরাহের সন্ধানে কিউবা পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের তেল বাজারে প্রবেশের চেষ্টা বাড়িয়েছে, তবে বিকল্প উৎসের পরিমাণ বর্তমান চাহিদা পূরণে যথেষ্ট নাও হতে পারে। ফলে তেলের দামের ওঠানামা এবং জ্বালানি ঘাটতি দেশের শিল্প ও গৃহস্থালী খাতে প্রভাব ফেলতে পারে।
দে সেসপেডেসের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের চাপ কিউবার স্বায়ত্তশাসন বা দৃঢ়সংকল্পকে দুর্বল করতে পারবে না। তিনি ফিদেল কাস্ত্রোর বিপ্লবী আদর্শের কথা উল্লেখ করে কিউবার জনগণকে আত্মবিশ্বাসী ও স্বাধীনতার রক্ষায় প্রস্তুত বলে পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তার বক্তব্যে দেশপ্রীতি ও শান্তির অধিকার রক্ষার ইচ্ছা জোর দিয়ে বলা হয়েছে যে, কিউবা কোনো ধরনের ভয় অনুভব করবে না।
কিউবার কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই ঘটনাকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থের প্রশ্ন হিসেবে দেখা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের ফলে কিউবা-ভেনেজুয়েলা সম্পর্কের তীব্রতা বাড়তে পারে, যা ল্যাটিন আমেরিকায় রাজনৈতিক গতিবিদ্যায় প্রভাব ফেলবে। একই সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রের এই নীতি আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন ও বাণিজ্য নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা তা নিয়ে আলোচনা চালু রয়েছে।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের এই কার্যক্রমের পরবর্তী ধাপ হিসেবে কিউবা অন্যান্য আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে কূটনৈতিক সমর্থন খোঁজার সম্ভাবনা রয়েছে। তেলের সরবরাহের বিকল্প নিশ্চিত করতে কিউবা আঞ্চলিক সংস্থা ও দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে নতুন চ্যানেল গড়ে তোলার চেষ্টা করতে পারে। তবে, যুক্তরাষ্ট্রের চাপ অব্যাহত থাকলে কিউবার অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার দীর্ঘমেয়াদে কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
সারসংক্ষেপে, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক নৌবাহিনীর জাহাজ জব্দ এবং ভেনেজুয়েলা তেল রপ্তানির উপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা কিউবার তেল সরবরাহে উল্লেখযোগ্য বাধা সৃষ্টি করেছে। কিউবা বিকল্প উৎসের সন্ধানে সক্রিয় হলেও, ভেনেজুয়েলার তেলের অভাব দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় চাপ বাড়াবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। কিউবার রাষ্ট্রদূত দে সেসপেডেসের দৃঢ় অবস্থান এবং ফিদেল কাস্ত্রোর আদর্শের উল্লেখ কিউবার আন্তর্জাতিক মঞ্চে আত্মবিশ্বাস বজায় রাখার ইচ্ছা প্রকাশ করে। এই পরিস্থিতি ল্যাটিন আমেরিকায় শক্তি ভারসাম্য এবং বাণিজ্যিক সম্পর্কের পুনর্গঠনকে উত্সাহিত করতে পারে, যা ভবিষ্যতে আঞ্চলিক কূটনৈতিক আলোচনার মূল বিষয় হয়ে উঠবে।



