বাংলাদেশে পুলিশ সংস্থার কাঠামো ও কার্যপ্রণালী নিয়ে সমালোচনা তীব্রতর হয়েছে, বিশেষত জুলাই মাসে শহর জুড়ে অনুষ্ঠিত প্রতিবাদে ব্যবহৃত সহিংসতা এবং র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (RAB) সংক্রান্ত অতিরিক্ত বিচারহীন হত্যাকাণ্ডের পরিপ্রেক্ষিতে।
অর্থনীতিবিদ দারন আছেমোগলু ও জেমস আর. রবিনসন “Why Nations Fail” গ্রন্থে যুক্তি দেন যে দুর্বল শাসনের মূল কারণ ভৌগোলিক, জলবায়ু বা সাংস্কৃতিক নয়, বরং প্রতিষ্ঠানের শোষণমূলক স্বভাব। তারা বলেন, শোষণমূলক প্রতিষ্ঠানগুলো স্বল্পমেয়াদী এলিট স্বার্থ রক্ষা করে, বৃহত্তর জনগণের অধিকারকে উপেক্ষা করে এবং প্রায়শই ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার বহন করে।
এই তত্ত্বের আলোকে বাংলাদেশকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশের বেশিরভাগ রাষ্ট্রীয় কাঠামো, বিশেষত পুলিশ, ঐতিহাসিকভাবে শোষণমূলক বৈশিষ্ট্য বহন করে। ঔপনিবেশিক শাসনকালে গৃহীত পুলিশ ব্যবস্থা নাগরিককে অধিকারধারী ব্যক্তি হিসেবে নয়, ক্ষমতার রক্ষাকর্তা হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছিল। ফলে মানবাধিকারকে প্রায়শই অপারেশনাল অগ্রাধিকারের বাইরে রাখা হয়েছে।
বছরের পর বছর এই শোষণমূলক প্রবণতা বিভিন্ন রূপে প্রকাশ পেয়েছে। র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নসহ বিভিন্ন ইউনিটের মাধ্যমে অতিরিক্ত বিচারহীন হত্যাকাণ্ড, জোরপূর্বক অদৃশ্য হওয়া, নীচে গলা কাটা, কল্পিত মামলা তৈরি এবং নিষ্ঠুর শারীরিক নির্যাতন ঘটেছে। এসব কাজ প্রায়শই আইন ও শৃঙ্খলা রক্ষার বদলে রাজনৈতিক বিরোধী গোষ্ঠীকে দমন করার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে।
বিশেষত রাজনৈতিক বিরোধী দল ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই ধরনের কর্মকাণ্ডকে সরকারের ক্ষমতা বজায় রাখার উপায় হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তারা উল্লেখ করে, শাসনকালের সময় পুলিশকে রাষ্ট্রের শোষণমূলক বাহিনীর অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, যা নাগরিকের মৌলিক স্বাধীনতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
জুলাই ২০২৩-এ দেশের বিভিন্ন শহরে একাধিক প্রতিবাদে পুলিশের হিংসাত্মক হস্তক্ষেপের ফলে জনমত সম্পূর্ণভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। প্রতিবাদকারীরা শান্তিপূর্ণভাবে দাবি জানাতে গিয়ে রাব ও অন্যান্য ইউনিটের দ্বারা গুলিবিদ্ধ, গুলিবিদ্ধ এবং গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনাগুলো পুলিশকে রক্ষাকারী নয়, বরং দমনকারী হিসেবে চিত্রিত করেছে।
প্রতিবাদে ব্যবহৃত বলপ্রয়োগের পরিসর ও তীব্রতা জনসাধারণের মধ্যে পুলিশকে নিরপেক্ষ ও পেশাদার সংস্থা হিসেবে দেখার ধারণা সম্পূর্ণরূপে নষ্ট করেছে। ফলে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠী ও নাগরিক সমাজের মধ্যে পুলিশ সংস্কারের দাবি তীব্রতর হয়েছে।
অবিলম্বে interim সরকার এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ছয়টি সংস্কার কমিটির মধ্যে একটি হিসেবে পুলিশ সংস্কার কমিশন গঠন করেছে। কমিশনের কাজ হল বর্তমান পুলিশ কাঠামোর দুর্বলতা চিহ্নিত করা, মানবাধিকার রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন প্রস্তাব করা এবং শোষণমূলক প্রথা দূর করার পরিকল্পনা তৈরি করা।
অন্যান্য পাঁচটি কমিশন যথাক্রমে নির্বাচন, বিচার, অর্থনীতি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে সংস্কার নিয়ে কাজ করছে, যা সামগ্রিকভাবে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পুনর্গঠনকে লক্ষ্য করে। পুলিশ সংস্কার কমিশনের গঠনকে সরকারী রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।
বিপক্ষের দৃষ্টিকোণ থেকে সরকার জোর দিয়ে বলছে যে পুলিশ দেশের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য অপরিহার্য, এবং বর্তমান সংস্কার প্রস্তাবগুলো কেবলমাত্র দক্ষতা ও স্বচ্ছতা বাড়ানোর জন্য। তবে বিরোধী দল ও মানবাধিকার সংস্থা দাবি করে যে স্বাধীন তদারকি সংস্থা গঠন, পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত করা এবং রাবের মত বিশেষ ইউনিটের ক্ষমতা সীমিত করা জরুরি।
অগ্রগতির দিকনির্দেশনা নির্ধারণে পরবর্তী ধাপ হবে কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে আইনসভার মাধ্যমে সংশোধনী পাস করা এবং বাস্তবায়নের জন্য স্বতন্ত্র তদারকি মেকানিজম স্থাপন করা। যদি এই সংস্কারগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে পুলিশকে নাগরিকের অধিকার রক্ষাকারী সংস্থা হিসেবে পুনর্গঠন করা সম্ভব হবে এবং দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক সুনাম উভয়ই উন্নত হবে।
অবশেষে, জুলাই উত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ সংস্থার শোষণমূলক বৈশিষ্ট্য উন্মোচিত হয়েছে, যা দেশের শাসন কাঠামোর গভীর পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে। সরকার ও বিরোধী উভয় পক্ষই এখনই এই পরিবর্তনকে বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি ও নীতি নির্ধারণে মনোযোগ দিতে হবে।



