২৫ জানুয়ারি রবিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল‑১-এ সাবেক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসিনুর রহমান তার গুমের সময়কালে “আয়নাঘর” নামে পরিচিত যৌথ জিজ্ঞাসা কক্ষের ভয়াবহ অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা দেন। তিনি এক ও এক½ বছর পর্যন্ত সেখানে আটক ছিলেন এবং জবানবন্দি গ্রহণকারী তিন সদস্যের প্যানেল তার বক্তব্যকে নথিভুক্ত করেছে।
হাসিনুর, যিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রাক্তন কর্মকর্তা, প্রথম গুমের শিকার হন ৯ জুলাই ২০১১-এ ময়মনসিংহ সেনানিবাসে কর্মরত অবস্থায়। ৪৩ দিন গুমের পর তাকে সেনা আদালতে প্রহসনমূলক বিচারে আনা হয় এবং চার বছরের সাজা দেওয়া হয়।
প্রথম সাজা শেষে মুক্তি পাওয়ার পর ২০১৮ সালের ৮ আগস্ট সন্ধ্যায় তিনি আবার অচেনা ব্যক্তিদের হাতে পড়েন। লেফটেন্যান্ট কর্নেল যায়িদ আবদুল্লাহর অনুরোধে বাড়ি ছেড়ে বের হওয়ার পর, মিরপুর ডিএইচএস এলাকায় ঘুরে ফিরে বাড়ির পথে ১০ টার দিকে তাকে ৮‑১০ জন অপরিচিত ব্যক্তি ঘিরে ধরেন এবং তার সঙ্গী যায়িদ অদৃশ্য হয়ে যান।
হাসিনুরকে একটি মাইক্রোবাসে জোর করে তুলে নেওয়া হয়, হাতে হাতকড়া আর চোখে কালো কাপড় বেঁধে মাথায় জমটুপি পরিয়ে অজানা স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। তাকে প্রায় ৮ বাই ১০ ফুটের স্যাঁতসেঁতে, নোংরা কক্ষে রাখা হয়, যেখানে সর্বদা হাই‑ভোল্টেজ বাতি জ্বালিয়ে রাখা থাকত।
কক্ষের ভয়াবহ চিত্র তিনি বর্ণনা করেন: দেয়ালে রক্ত দিয়ে মোবাইল নম্বর লেখা ছিল, চৌকির বিছানার চাদরও রক্তমাখা ছিল। শীতাতপন নিয়ন্ত্রিত কক্ষের মধ্যে তাকে চেয়ারের সঙ্গে বেঁধে ইলেকট্রিক শকসহ শারীরিক নির্যাতনের শিকার করা হতো।
জিজ্ঞাসাবাদকারীরা ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচন এবং তার বিরোধী-ভারত লেখালেখি নিয়ে প্রশ্ন করতেন। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদও উপস্থিত ছিলেন বলে তিনি জানান। এক পর্যায়ে তাকে হত্যা করার চেষ্টা করা হয়, তবে তিনি বেঁচে ছিলেন।
ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদার নেতৃত্বে তিন সদস্যের প্যানেল তার জবানবন্দি গ্রহণ করে এবং ভবিষ্যৎ তদন্তে তা অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়।
হাসিনুর ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০-এ প্রায় এক ও অর্ধ বছর পর মুক্তি পান। মুক্তির পর তিনি আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহি করার দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল‑১-এ এই মামলার পরবর্তী শুনানি এই মাসের শেষের দিকে নির্ধারিত হয়েছে, যেখানে অতিরিক্ত সাক্ষী ও প্রমাণ উপস্থাপন করা হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, বিশেষত বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে তদন্তে সহযোগিতা করতে বলা হয়েছে।
এই জবানবন্দি এবং নির্যাতনের তথ্য আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার নজরে এসেছে এবং গুমের শিকারদের সুরক্ষা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য আইনি কাঠামোকে শক্তিশালী করার আহ্বান জানানো হয়েছে।



