কিউবার রাষ্ট্রপতি মিগুয়েল দিয়াস-কানেল শনিবার হাভানা শহরে একটি সামরিক মহড়া তদারকি করে জানিয়েছেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য আক্রমণ মোকাবিলায় দ্বীপটি প্রস্তুতিমূলক প্রশিক্ষণ চালাচ্ছে। ট্যাংক ইউনিটসহ বিভিন্ন শাখার সৈন্যদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এই মহড়া দেশের নিরাপত্তা নীতি শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে।
এই ঘোষণার পেছনে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক সতর্কতা, যেখানে তিনি কিউবাকে ‘পতনের জন্য প্রস্তুত’ বলে চিহ্নিত করে হাভানাকে ‘সমঝোতা করতে’ আহ্বান জানিয়েছেন। ট্রাম্প উল্লেখ করেন, যদি কিউবা শর্ত মেনে না চলে তবে ভেনেজুয়েলার মতো কঠিন পরিণতির মুখে পড়তে পারে।
ট্রাম্পের উল্লেখিত ভেনেজুয়েলা উদাহরণটি ৩ জানুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক অভিযানের সঙ্গে যুক্ত, যেখানে ভেনেজুয়েলার ক্ষমতাচ্যুত নেতা নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং অভিযানে বহু মানুষ নিহত হয়। ওই অভিযানটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ল্যাটিন আমেরিকায় হস্তক্ষেপের ইচ্ছা প্রকাশের একটি স্পষ্ট সংকেত হিসেবে বিবেচিত হয়।
সেই একই দিন, কিউবার সশস্ত্র বাহিনীর ট্যাংক ইউনিটকে কেন্দ্র করে বৃহৎ পরিসরের প্রশিক্ষণ শুরু হয়। প্রেসিডেন্ট দিয়াস-কানেল নিজে সরাসরি তদারকি করেন, সঙ্গে ছিলেন সশস্ত্র বাহিনীর মন্ত্রী কিউবান জেনারেল আলভারো লোপেস মিয়েরা এবং অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। এই উপস্থিতি প্রশিক্ষণের গুরুত্ব এবং সরকারের দৃঢ় ইচ্ছা প্রকাশ করে।
মহড়ার সময় সৈন্যরা সমন্বিত চালনা, সরাসরি গুলি চালনা এবং লজিস্টিক সমর্থনসহ বিভিন্ন দিকের অনুশীলন সম্পন্ন করে, যা কিউবার প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আধুনিকায়নের লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণটি কেবল তাত্ত্বিক নয়, বাস্তবিক পরিস্থিতি অনুকরণ করে সৈন্যদের দ্রুত প্রতিক্রিয়া এবং সমন্বয় ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।
মিগুয়েল দিয়াস-কানেল কিউবান রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক বক্তব্যে জোর দিয়ে বলেন, আক্রমণ রোধের সর্বোত্তম উপায় হল সাম্রাজ্যবাদকে আমাদের দেশে হামলার মূল্য কতটা বেশি হবে, তা হিসাব করতে বাধ্য করা। তিনি যুক্তি দেন, কোনো শক্তি যদি কিউবায় আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে তার জন্য যে খরচ হবে তা অত্যন্ত ভারী হবে এবং তা শেষ পর্যন্ত তার নিজস্ব স্বার্থের ক্ষতি করবে।
প্রেসিডেন্টের এই মন্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, কিউবা তার সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য কেবল সামরিক প্রস্তুতি নয়, কূটনৈতিক চাপেও জোর দিচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, কিউবা কোনো বাহ্যিক হুমকির মুখে তার স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসন ত্যাগ করবে না এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে তার অবস্থান রক্ষা করবে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক পরিকল্পনা প্রকাশিত হয়নি, তবে ট্রাম্পের তীব্র রেটরিক এবং ভেনেজুয়েলা উদাহরণে দেখা যায় যে, দু’দেশের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই পরিস্থিতি কিউবার নিরাপত্তা নীতি পুনর্বিবেচনা এবং সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে ত্বরান্বিত করেছে।
অঞ্চলীয় বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, কিউবার এই ধরনের সামরিক প্রস্তুতি ক্যারিবিয়ান ও ল্যাটিন আমেরিকান দেশগুলোর জন্য একটি সতর্কতা সংকেত হতে পারে, যারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বিগ্ন। কিউবার দৃঢ় পদক্ষেপকে সমর্থনকারী দেশগুলো সম্ভবত হাভানার নিরাপত্তা নীতি শক্তিশালী করতে সহায়তা করবে।
দেশীয় পর্যায়ে, এই মহড়া সরকারকে অভ্যন্তরীণভাবে শক্তিশালী করার একটি সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। জনগণের মধ্যে নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে, সরকার তার রক্ষা ক্ষমতা প্রদর্শন করে জনমতকে স্থিতিশীল করতে চায়।
কিউবার সামরিক কর্মকর্তারা ভবিষ্যতে আরও প্রশিক্ষণ, আধুনিক অস্ত্র সরঞ্জাম এবং কৌশলগত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথা জানিয়েছেন। তারা জোর দিয়ে বলছেন যে, সশস্ত্র বাহিনী সর্বদা সতর্ক থাকবে এবং যে কোনো হুমকির মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকবে।
সারসংক্ষেপে, কিউবার সামরিক মহড়া এবং প্রেসিডেন্টের দৃঢ় বক্তব্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের বর্তমান উত্তেজনা এবং ভবিষ্যৎ কৌশলগত প্রতিযোগিতার সূচক। উভয় পক্ষই নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা ল্যাটিন আমেরিকায় নিরাপত্তা পরিবেশকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।



