২৫ জানুয়ারি রবিবার, আন্তর্জাতিক কাস্টমস দিবসের উপলক্ষে আগারগাঁওয়ের জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ভবনে অনুষ্ঠিত মিট‑দ্য‑প্রেসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বাজারে ফলসহ আমদানি‑নির্ভর পণ্যের মূল্যের বৃদ্ধি সম্পর্কে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেন। তিনি উল্লেখ করেন, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি মূলত এই পণ্যের দাম বাড়ার প্রধান চালিকাশক্তি, কর বা শুল্কের পরিবর্তে।
চেয়ারম্যানের মতে, গত দেড় বছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কোনো পণ্যের শুল্ক বাড়ায়নি। বরং চাল, পেঁয়াজ, আলু ও সয়াবিনের মতো মৌলিক খাদ্যদ্রব্যের আমদানি শুল্ক কমিয়ে জনস্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করা হয়েছে। এই নীতি অনুসারে, শুল্ক হ্রাসের মাধ্যমে ভোক্তাদের উপর আর্থিক চাপ কমানোই লক্ষ্য ছিল।
ফলজাত পণ্যের ক্ষেত্রে, শুল্কের কোনো বৃদ্ধি ঘটেনি; বরং পূর্বে ১০ শতাংশ ইনকাম ট্যাক্স আরোপিত ছিল, যা এখন ৫ শতাংশে কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। একইসাথে, খেজুরের আমদানিতে উল্লেখযোগ্য হারে শুল্ক কমানো হয়েছে, যা বাজারে দাম স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করবে। এই পদক্ষেপগুলোকে তিনি জনস্বার্থের স্বীকৃত প্রয়োজনীয়তা হিসেবে তুলে ধরেছেন।
ডলারের মূল্যবৃদ্ধি সম্পর্কে তিনি স্পষ্ট সংখ্যা উপস্থাপন করেন। দুই বছর আগে ডলার প্রতি ৮০–৮৫ টাকা ছিল, বর্তমানে তা প্রায় ১২৬–১২৭ টাকায় পৌঁছেছে, যা প্রায় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি নির্দেশ করে। ডলারের এই উত্থান সরাসরি আমদানি খরচ বাড়িয়ে তুলেছে, ফলে বিদেশি পণ্যের দাম স্বাভাবিকভাবেই বাড়ছে।
ডলারের উত্থানকে পণ্যমূল্য বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হলে, অন্যান্য কোনো কর বা শুল্কের পরিবর্তনকে ব্যাখ্যা হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। আমদানি খরচের এই বৃদ্ধি সরাসরি ভোক্তাদের পকেটের ওপর প্রভাব ফেলছে এবং বাজারে মূল্যস্ফীতি ত্বরান্বিত করছে।
সরকারের আর্থিক নীতি সম্পর্কে তিনি জানান, শুল্ক কাঠামোকে যৌক্তিক করার দিকে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রধান উপদেষ্টার কাছে ট্যারিফ ট্রান্সফরমেশন সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে, যেখানে শুল্ক হ্রাসের সুপারিশ রয়েছে। এই রূপান্তর পরিকল্পনা দেশের অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা বাড়ানোর লক্ষ্যে গৃহীত।
এছাড়া, লিডারশিপ ডেভেলপমেন্ট ক্যাটেগরি (LDC) থেকে উত্তীর্ণ হওয়ার পর বাংলাদেশ উচ্চ শুল্ক কাঠামো বজায় রাখতে পারবে না, এ কথাও তিনি উল্লেখ করেন। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে শুল্ক হ্রাসের প্রয়োজনীয়তা বাড়বে, যা রপ্তানি ও আমদানি উভয় ক্ষেত্রেই সুবিধা দেবে।
তবে, দেশীয় শিল্প সুরক্ষার স্বার্থে কিছু ক্ষেত্রে শুল্ক বাড়ানো হতে পারে, এ বিষয়েও তিনি সতর্কতা প্রকাশ করেন। স্থানীয় উৎপাদনকে রক্ষা করার জন্য নির্দিষ্ট পণ্যের ওপর লক্ষ্যভিত্তিক শুল্ক নীতি প্রয়োগ করা হবে, যা বাজারের স্বাভাবিক প্রবাহে প্রভাব ফেলবে।
রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা সম্পর্কে প্রশ্নের উত্তর দিয়ে তিনি বলেন, যদিও লক্ষ্য চ্যালেঞ্জিং, সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি সন্তোষজনক। অনলাইন রিটার্ন বাধ্যতামূলক করার পর থেকে সংগ্রহে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেখা গেছে। এই ডিজিটাল ব্যবস্থা করদাতাদের স্বচ্ছতা ও সময়মত দায়িত্ব পালন নিশ্চিত করেছে।
অনলাইন রিটার্ন ব্যবস্থার অধীনে এখন পর্যন্ত প্রায় ৪.৭ লক্ষ করদাতা নিবন্ধিত হয়েছে। এই সংখ্যা দেশের করভিত্তি বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এবং ভবিষ্যতে রাজস্ব বাড়াতে সহায়ক হবে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে রিটার্ন জমা দেওয়া প্রক্রিয়া সহজতর হয়েছে, ফলে দেরি ও ত্রুটি কমেছে।
সারসংক্ষেপে, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি আমদানি‑নির্ভর পণ্যের দামের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, আর শুল্ক বা করের পরিবর্তনকে মূল কারণ হিসেবে দেখা যায় না। শুল্ক কাঠামোর যৌক্তিকতা, LDC উত্তীর্ণ হওয়ার পর শুল্ক নীতির পরিবর্তন এবং ডিজিটাল কর রিটার্নের প্রসার—all together—ভোক্তা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে বিবেচিত হবে।



