বিবিসি (Bbc) এর প্রাক্তন বিদেশি প্রতিবেদক এবং বহু বছর ধরে ভারতের কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত মার্ক টালি ৯০ বছর বয়সে আর জীবিত নন। তার মৃত্যু সংবাদ মাধ্যমের মধ্যে গভীর শোকের স্রোত তৈরি করেছে।
মার্ক টালি ১৯৬০ দশক থেকে ২০০০ দশকের শেষ পর্যন্ত বিবিসি-র প্রধান ভারতীয় প্রতিবেদক হিসেবে কাজ করেছেন। ইংরেজি ভাষায় তার মধুর স্বর এবং গভীর বিশ্লেষণ ক্ষমতা বিশ্বব্যাপী শ्रोतাদের কাছে পরিচিত ছিল।
তার ক্যারিয়ারের মধ্যে যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, ধর্মঘট, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, ভোপাল গ্যাস দুর্যোগ এবং সিখ স্বর্ণমন্দিরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর আক্রমণসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা কভার করেছেন। এসব কভারেজ তাকে আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতার মানদণ্ডে উচ্চ স্থান দিয়েছে।
১৯৯২ সালে উত্তর ভারতের অয়োধ্যায় তিনি একটি ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী হন। হিন্দু উগ্রবাদের দল একটি প্রাচীন মসজিদ ধ্বংস করতে গিয়ে তাকে “মার্ক টালি মারা যাক” চিৎকারে হুমকি জানায়। কয়েক ঘণ্টা একটি ঘরে আটকে রাখার পর স্থানীয় একজন কর্মকর্তা ও হিন্দু পুরোহিতের হস্তক্ষেপে তিনি মুক্ত হন।
এই ধ্বংসকাণ্ডের পর দেশের সর্বোচ্চ মাত্রার সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। টালি পরবর্তীতে এটিকে ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতা পরবর্তী ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষার জন্য সবচেয়ে বড় আঘাত হিসেবে উল্লেখ করেন।
মার্ক টালি ১৯৩৫ সালে কলকাতায় (তখন ক্যালকাটা) জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ব্রিটিশ শাসনের শেষ সময়ে বেড়ে ওঠেন; তার পিতা ব্যবসায়ী এবং মাতৃভূমি বাংলা, যেখানে তার পরিবার বহু প্রজন্ম ধরে বাণিজ্য ও প্রশাসনিক কাজ করে আসছে।
শৈশবে তিনি একটি ইংরেজি ন্যানির তত্ত্বাবধানে বড় হন, যিনি একবার তাকে গাড়ি চালকের মতো সংখ্যা গণনা করার জন্য তিরস্কার করেন, “এটি গৃহকর্মীর ভাষা, তোমার নয়” বলে। তবু তিনি হিন্দি ভাষা শিখে দক্ষতা অর্জন করেন, যা দিল্লির বিদেশি সাংবাদিকদের মধ্যে বিরল ছিল।
হিন্দিতে পারদর্শিতা এবং ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতি তার আন্তরিক ভালোবাসা তাকে “টালি স্যাহিব” উপাধি এনে দেয়। বহু রাজনীতিবিদ, সম্পাদক ও সামাজিক কর্মীর সঙ্গে তার বন্ধুত্ব ও বিশ্বাসের সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যা তার প্রতিবেদনে স্বতন্ত্র স্বর যোগায়।
তার জীবনের মূল নীতি ছিল ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করা, তবে ভারতকে নিজের ঘর হিসেবে গণ্য করা। তিনি কখনোই নিজেকে অস্থায়ী বিদেশি হিসেবে বিবেচনা করেননি; তার শিকড়ই এখানে, তার পরিচয়ই এখানে।
মার্ক টালির অবদান শুধুমাত্র সংবাদ প্রতিবেদনেই সীমাবদ্ধ নয়; তিনি বহু প্রজন্মের সাংবাদিককে আন্তর্জাতিক মানের রিপোর্টিং শিখিয়েছেন এবং ভারতীয় জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তার মৃত্যু সংবাদ জগতের এক যুগের সমাপ্তি নির্দেশ করে।
তার পরিবার ও সহকর্মীরা শোক প্রকাশের পাশাপাশি তার স্মৃতিকে সম্মান জানাতে বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজনের পরিকল্পনা করছে। মার্ক টালির কর্মজীবন এবং ভারতপ্রেম ভবিষ্যৎ সাংবাদিকদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে রয়ে যাবে।



